ত্রিত্ববাদ (#TRINITY)



ত্রিত্ববাদ হইল স্বর্গীয় সকল ধর্ম বিধানের মূল উৎস। ইহা আল্লাহ্‌র কেতাবের কর্মকাণ্ড সংগঠনের পদ্ধতি বা ভিত্তি। কিন্তু ধর্মের এই ভিত্তি হইতে বিশ্বের সকল ধর্মই কিছু না কিছু সরিয়া যাইয়া সামগ্রিকভাবে বিশ্ব মানব ধর্মকে দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছে। বিষয়টির অপব্যবহার এবং ইহার উপর ভুল ধারণাই তার ভিত্তিকে একেবারে দুর্বল করিয়া ফেলিয়াছে।
প্রকৃত ত্রিত্ববাদ হইলঃ (১) পরম পিতা আল্লাহ্‌ (২) তাঁহার পুত্রগণ এবং (৩) পবিত্র আত্মা বা পবিত্র ভূত। "তাঁহার পুত্রগণ" হইলেন মহা নবীর পূর্ববর্তী সকল নবী রসুলগণ এবং তাঁহার পরবর্তী ধর্মগুরুগণ। বিশ্বের সকল মোর্শেদ অর্থাৎ পীর সাহেব তথা সম্যক গুরুগণ সবাই তাঁহার পুত্র। কোরানের ভাষায় ইহাকে "আলে মোহাম্মদ" বলা হইয়াছে। সর্ব জাতির সকল কামেল মোর্শেদই "আলে মোহাম্মদ" বা মোহাম্মদের পুত্র।
পবিত্র আত্মা বা পবিত্র ভূত বলিতে সৎগুরুর অনুসারী শিষ্য বর্গকে বুঝায় যাহারা নিষ্ঠার সহিত গুরুর অনুসরণ এবং অনুকরণে লাগিয়া আছে।

প্রত্যেক মানুষের পরম পিতা বা পরম প্রভু আল্লাহতা'লাই নিহিত রহিয়াছেন। অতএব একজন মানুষের অভ্যন্তরে আছেন আল্লাহ্‌। বাহিরে আছেন তাহার পরিচালক হিসাবে সৎগুরু। এবং সে নিজে হইল আত্মা, ভূত, অসুর বা জিন। যখন সে শিষ্যরূপে তাহার গুরুর প্রতি একনিষ্ঠ ভাবে লাগিয়া থাকে তখন তাহাকে বলা হয় পবিত্র আত্মা, পবিত্র ভূত বা পবিত্র জিন। এখন সে আর সাধারণ ভূত নয়। অতএব পরিপূর্ণভাবে পবিত্র হইয়া মোমিন হওয়ার জন্য যে শিষ্য অনুশীলনে রহিয়াছেন তাহাকেই "পবিত্র আত্মা" বলা হইয়াছে।
তিনিই "আল্লাহ্‌র পুত্র" যিনি স্বয়ং পবিত্র হইয়া পবিত্র একজন পিতারূপে তাঁহার শিষ্যগণকে হেদায়েত দানের কর্তব্য পালনে রত আছেন। খ্রিস্টান জগতে প্রচারিত একটি পবিত্র ভূত অর্থাৎ একজন পবিত্র আত্মা কথা দ্বারা গুরুর নির্দেশ সযত্নে পালনকারী ফেরেস্তা স্বভাব একজন শিক্ষানবীশকেই বুঝায়, যদিও তাহার এইরূপ অর্থ গ্রহণ করিতে পারে নাই। এইরূপ একজন একনিষ্ঠ শিক্ষানবীশ পরিণামে নিজেই আল্লাহর একজন পুত্র হইয়া যান।
সুতরাং খ্রিস্টানগণ তাহাদের ধর্মের এই তিনটি মূলনীতি বিষয়ের প্রত্যেকটির মধ্যে ভ্রান্তি আরোপ করিয়া লইয়াছে। এইরূপ হওয়ার কারণ তাহাদের পরম পিতাকে (God Father) ঐতিহাসিক কোন ব্যক্তিত্বের মধ্যে সনাক্ত করিতে পারেন নাই, যেই কারণেই তাহারা পরম অস্তিত্বকে আকাশে মহাশূন্যে স্থাপন করিতে বাধ্য হইয়া থাকেন।
তাহারা অনায়াশে উপস্থিত গুরুকে "আল্লাহ্‌র পুত্র" রূপে সনাক্ত করিতে পারিতেন। তাহা না করিয়া যিশু খৃষ্টকে তাহারা আল্লাহ্‌র পুত্ররূপে সনাক্ত করিয়া নিজেদেরকে প্রভুগুরু হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিয়াছেন। কালের একটি ব্যবধানের কারণে যিশুর (আ) সঙ্গে তাহারা তাহাদের প্রভুগুরুরূপে সংযোগ লাগাইতে পারেন নাই। যদিও তাঁহাকেই তাহাদের "আল্লাহ্‌র পুত্র" রূপে গ্রহণ করিয়া থাকেন। অবশ্য যিশু (আ) ছিলেন তাঁহার উপস্থিত শিষ্যবর্গের জন্য মহা শক্তিশালী একজন "আল্লাহর পুত্র" (Son God) মূক্তি পথের দিশারী রূপে উপস্থিত একজন আল্লাহ্‌র পুত্রকে প্রভুগুরুরূপে অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে।

খৃষ্টানগণ "পবিত্র আত্মা" (holy ghost) বিষয়েও চিন্তার গোলযোগে আছেন। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের অন্য সব সাধারণ মানুষের মত একজন সাধারণ খৃষ্টানও একজন ভূত। এই ভূতকে পবিত্র হইতে হইবে একজন সম্যক গুরুর সংস্পর্শের সাহায্য গ্রহণ করিয়া। তাহারা নিজের মধ্যে এই ভূতকে না দেখিয়া বাহিরে আরোপ করিয়া থাকেন।
এইরূপে আমরা দেখিতে পাই যে, খৃষ্টানগণ তাহাদের ত্রিত্ববাদের প্রত্যেকটি বিষয়ে গোলযোগপূর্ণ অবস্থায় রহিয়াছেন।

এই বিষয়ে মুসলমানদের সম্বন্ধে বলিতে গেলে এইকথা দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা চলে যে, তাহারা ত্রিত্ববাদকে ধর্মের একটি নীতি বা ভিত্তিরূপে মোটেই গ্রহণ করিতে চায় না। বরং তাহারা ইহাকে ধর্মের প্রতি একটি অপবাদ রূপেই মনে করে। ইহা তাহাদের নিছক মূর্খতা এবং বোকামি ব্যতীত কিছুই নয়। এইরূপে ত্রিত্ববাদকে অস্বীকার করিয়া অধিকাংশ মুসলমানরা আসলে ধর্মের মূল ভিত্তিকেই অস্বীকার করিয়া থাকে।
উপসংহারে বলিতে হয় যে, বিশ্বের সমগ্র মানব জাতির জন্য মোহাম্মদ আ. হইলেন পরম পিতা আল্লাহ্‌ (God the father), যদিও জগতবাসী তাঁহাকে এইরূপে গ্রহণ করিতে রাজী নয়। অন্য লোকের কথা দূরে থাক, কোরানে প্রকাশিত এই মহাসত্য, তাঁহার তথাকথিত অনুসারীগণ নিজেরাই গ্রহণ করিতে রাজী নয়। তাহাদের ধর্মদ্রোহী ভাব এতই প্রবল যে, কোরানে নানাভাবে ইহার প্রকাশ থাকা সত্ত্বেও তাহারা এই ভাবটি লুকাইয়া রাখিতে যত্নবান। মানব জাতির মুক্তির জন্য সকল নবী রসুলগণ যাহারা তাঁহার পূর্বে আগমন করিয়াছেন এবং সকল আলে রসুলগণ যাহারা তাঁহার পরে আসিয়াছেন এবং আসিতে থাকিবেন তাঁহারা সবাই আল্লাহ্‌র পুত্র (Son God) (দ্র. ৩:৮১)। কোরান মতে যেই সকল নরনারী তাহাদের মনশুদ্ধি তথা আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে শুদ্ধি সাধনাকারী কোন একটি দলভুক্ত হয় না তাহারা অশুদ্ধ এবং তাহারাই জিন (অর্থাৎ ভূত); যদিও তাহারা মানব আকারে জীবন যাপন করে। তাহাদিগকে "ইনসান" (অর্থাৎ ভাল মানুষ) বলা হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে সকল ভাল মানুষ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে তাহাদের মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হইয়াছে পবিত্র ব্যক্তিগণ হইতেই। এই কারণেই তাহাদিগকে "নফসে লাউয়ামা" (পবিত্র নফস তথা ভূত তথা ধার্মিক ব্যক্তি) বলা হয়। বিশ্বের সকল ধর্মের এই সফল ধার্মিক ব্যক্তিগণই পবিত্র ভূত বা পবিত্র আত্মা (holy ghost)। বাকি সবাই অপবিত্র, তাহা এইজন্যই যে, তাহারা সবে মাত্র পশু জগত ও পশু জীবন হইতে উত্তোরিত হইয়া বর্তমান মনুষ্য আকার প্রাপ্ত হইয়াছে; কিংবা ভূতের জগত ও জীবন হইতে পুনরায় ভূত হইয়াই আসিয়াছে কিন্তু প্রভুগুরুর শিক্ষা ও দিক্ষা গ্রহণ করে নাই। নিম্নমানের মনুষ্য জীবনে তথা জিনজীবনে তথা ভূতের জগতে বা আত্মার জগতে রহিয়াছে।

এক কথায় জাগ্রত পবিত্র মনের তিনটি পর্যায়কে ত্রিত্ববাদ বলা হয়। এই তিন পর্যায়কে সাধারণ ভাবে "আল্লাহ্‌ পর্যায়" বলা যাইতে পারে। ত্রিত্ববাদের ধারাতেই মানবত্মায় একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
তথা মানুষের মধ্যেই "আল্লাহ্‌ অবস্থা" বিরাজ করে এই তিন রূপে বা তিন অবস্থায়। ইহার নিম্নতম অবস্থা হইল পবিত্র আত্মা। পবিত্র আত্মা পর্যায়ে যারা পৌঁছে না তাহারা অখণ্ড অস্তিত্বের মধ্যে পশু পর্যায়ভুক্ত, আল্লাহ্‌ পর্যায় নয়।
আল্লাহ্‌ তবারক, ত্রিত্ববাদের ধারায় প্রকৃতির মধ্যে চির বর্ধিষ্ণূ।

....................................................... 
ত্রিত্ববাদের পর্যালোচনা 
.......................................................

সদর উদ্দিন আহমদ চিশতী
ত্রিত্ববাদের উপর আমার লিখিত ক্ষুদ্র প্রবন্ধটি পড়িয়া কেহ কেহ ভ্রান্তিমূলক উক্তি বলিয়া থাকেন। তাহাদের যুক্তি হইল কোরান বলিয়াছেন :"আল্লাহ কোন পুত্র গ্রহণ করেন না।" আল্লাহ দৈহিক ভাবে কোন পুত্র গ্রহণ করেন না একথা সত্য কিন্তু তিনি নূরের পুত্ররূপে তিনি প্রতিপালন ক্রিয়া সম্পাদন করিয়া "পরম পিতা" অর্থাৎ আপন জাত নূরের আলোর পুত্র তৈরী করিয়া তোলার জন্য চির আকাঙ্খিত হইয়া আছেন।
ঈসার (আ) পিতার নাম সাধারণ ভাবে অজ্ঞাত। আল্লাহর ইচ্ছা ক্রমেই তাঁহার জন্ম হইয়াছে বিধায় অজ্ঞান খৃষ্টানেরা যেভাবে তাঁহাকে "আল্লাহর পুত্র" বলিতে শুরু করিয়াছিল তাহার জবাবে কোরানে এইরূপ উক্তি প্রকাশ করা হইয়াছে। আল্লাহ বস্তুমোহ নিরপেক্ষ ---সুতরাং দেহ নিরপেক্ষ। কিন্তু তিনি তাঁহার জাত নূর অর্থাৎ আপন গুণাবলী হইতে কখনও নিরপেক্ষ ভাব গ্রহণ করিতে পারে না। এখানে তিনি নিজেই নিজরূপে বহু আকারে নিজেকে প্রকাশ করিতেছেন অক্ষয় একটি একক রূপের মধ্যে। অপরপক্ষে বস্তুরূপের বিকাশগুলিও তাহা হইতেই প্রকাশিত হইলেও সেগুলি অক্ষয় অব্যয় নয়। এইরূপে আপন হইতে উৎপন্ন তাঁহারাই যত্নে লালিত পালিত নূরাণী ব্যক্তি হিসাবে এই জাতীয় মহৎ ব্যক্তিত্বকে "আল্লাহর পুত্র " বলা হইয়াছে।
রসুলাল্লাহ আ. আল্লাহ্‌র সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি এবং তাঁহারাই জাহেরি প্রতিচ্ছবি (phototype) এই হিসাবে আল্লাহ্‌র স্বভাবের সমস্ত প্রকাশ আমরা রসুল্লাহর মধ্যে দেখিতে পাই। রসুলাল্লাহ মানুষরূপে আল্লাহরই প্রকাশ। মানুষ হিশেবে তাঁহার তিনটি পুত্র সন্তান জন্মিয়াছে কিন্তু আল্লাহ্‌র বিকাশ ও স্বভাব তাঁহার মধ্যদিয়া প্রমাণ করিয়া দেখাইবার জন্য তিনি পুত্রগণকে শৈশবকালে বিদায় করিয়া দিয়াছিলেন। তিনি হাসান, হোসাইন এবং তাঁহাদের পরবর্তী সকল নূরের সন্তানগণকে তাঁহার আপন পুত্ররূপে ঘোষণা করিলেন। তাই আমরা দেখিতে পাই রাসুল বংশের পরবর্তী সকল ইমামগণকে “ইবনে রসুল” বলিয়া সম্বোধন করিত। তাঁহারা রক্তের স্রোতধারার(অর্থাৎ দেহগত) পুত্র নন বরং আল্লাহ্‌র নূরের স্রোত ধারার পুত্র। এইরূপ মহান পুত্র তৈরি করা অসাধারণ ব্যাপার। রসুল বংশের প্রতি বিরোধিতা এবং শত্রুতা প্রকাশের কারণেই পরবর্তীকালে এইসব কথা সমাজ হইতে লোপ করা হইয়াছে। এইরূপ করিবার কারণেই স্বয়ং রসুলকেও আমাদের মত মানুষ প্রমাণের জন্য তথাকথিত আলেম সমাজ ব্যস্ত হইয়া পড়েন।
ত্রিত্ববাদ নামক প্রচার পত্রে মহানবীকে “পিতা আল্লাহ্‌” বলা হইয়াছে। প্রচার পত্রটি খৃস্টানগণকে লক্ষ্য করিয়া লেখার কারণেই তাহাদেরই ধারায় “পিতা আল্লাহ্‌” শব্দটি ব্যবহার করা হইয়াছে। কোন কোন আরবি পণ্ডিতের মতে ইহা ধর্মবিরোধী উক্তি বলিয়া মনে হইয়াছে। আল্লাহ্‌কে যাহারা শুধুই নিরাকার রূপে কল্পনা করিয়া সপ্ত আকাশের উপর মহাশূন্যে স্থাপন করিয়া থাকে তাহারাই প্রকৃতই মোশরেক এবং অজ্ঞান। আল্লাহর আহাদ রূপের তৌহিদ জ্ঞান তাহাদের ভাগ্যে কখনও জুটিবনা, যতকাল বহুর মধ্যে একের প্রকাশ তাহারা সজ্ঞানে গ্রহণ না করিবে। আল্লাহ্‌র স্বরূপকে একক মনে না করিয়া তাঁহাকে এক মানিলেই তৌহিদ হয়না। তৌহিদ জ্ঞান অর্থাৎ অদ্বৈত জ্ঞান এত সহজ বিষয় নয়। এক নিরাকার আল্লাহ্‌ মানিলেই তৌহিদ জ্ঞান হইত তবে এদেশের "আহলে হাদিস"গণ সবাই মহা জ্ঞানের অধিকারী হইত। অথচ দেখা যায় ধর্ম জ্ঞানে তাহারা একেবারেই হীন পর্যায়ভুক্ত। তাহারা শক্ত দ্বৈতবাদী।
আল্লাহ্‌র সর্বশ্রেষ্ঠ বিকাশ হিসাবে মহানবী হইলেন জগতের পিতৃস্থানীয়। আল্লাহ্‌র নূর হইতে তাঁহার নূরের বিকাশ এবং তাঁহার নূর হইতে এই মহা অস্তিত্বের সকল বিকাশ হইয়াছে। এইরূপে তিনি সকল সৃষ্টির পিতা। খাস করিয়া তিনি সকল মনুষ্যকুলের পিতা। আরও খাস করিয়া তিনি মহৎ ব্যক্তিবর্গের পিতা। ধর্ম সাহিত্যে ধার্মিকগণ আদমকে (আ.)মনুষ্যজাতির পিতা বলিয়া থাকেন। কিন্তু হাকিকতে মোহাম্মদ আ. আদমের বহু বহু আগে অস্তিত্বে অস্তিত্ববান। তাঁহার আগে অন্য কিছু ছিল না, তাই মোহাম্মদ আ. সর্ব সৃষ্টির পিতা।“হুয়া জাহেরু অল বাতেনু” তিনি জাহের এবং বাতেনের সর্ব অবস্থায় পরম পিতা।
শুনতে পেলাম কয়েকজন আলেম এবং উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি আমার এই প্রবন্ধে কয়েকটি মারাত্মক ভুল দেখিতেছেন। বিশেষ করে তৃতীয় পৃষ্ঠার (৩৩:৬) নং বাক্যের উদ্ধৃতি একেবারেই নাকি স্বেচ্ছাচারী এবং ভ্রান্তিমূলক হইয়াছে। এর কারণ তাহারা এই বাক্যে রসুলাল্লাহকে “পিতা আল্লাহ্‌” রূপে দেখিতে পান না। তাই তাদের মতে আমি নাকি মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য স্বেচ্ছাচারী এবং ভ্রান্তিমূলক উদ্ধৃতি দিয়া দিশাহারা করিতে চাই।
আমি এই ক্ষুদ্র নিবন্ধটি এমন খাম খেয়ালির সহিত লিখি নাই যে, কেহ ইহার একটি বাক্যও ভুল প্রমাণ করতে পারবে। যাহারা আরবি শিক্ষিত কিন্তু কোরান বুঝেন না তাহাদের পক্ষে এইরূপ মন্তব্য করা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
কোরান (৩৩:৬) নং বাক্যে মহানবীর স্ত্রীগণকে বিশ্বাসীগণের মাতা বলা হইয়াছে। মহানবীর পিতৃত্ব স্বীকার না করিয়া তাঁহার স্ত্রীগণকে মাতারূপে গ্রহণ করা যায় কি? মহানবীর পিতৃত্ব একটি বাস্তব আধ্যাত্মিক রহস্যময় বিষয়। যেহেতু তাঁহার নূর হইতে আমাদের সকলের আগমন হইয়াছে সেইহেতু আমাদের মধ্যে যাহারা মোহাম্মদী নূরে নুরান্বিত তাঁহারা কি আরও অধিক ঘনিষ্ঠভাবে মোহাম্মদের (আ.) পুত্র নহেন? মোমিনদের জন্য তাঁহার পিতৃত্ব এত মহান এবং ঘনিষ্ঠভাবে যে, তাঁহার খাতিরে তাঁহার স্ত্রীগণকে মোমিনের মাতা বলা হইয়াছে, যদিও মোমিন ব্যক্তির মা হওয়ার যোগ্যতা তাহাদের কাহার কতটুকু ছিল বলা মুস্কিল। পিতার ইজ্জতের কারণেই মোমিনদের মাতারূপে বিশেষ সম্মানে তাঁহারা ভূষিত হন নাই কি?
অনিচ্ছা সত্বেও আরেকটি কথা এই বাক্য সম্বন্ধে উল্লেখ করিতে প্রয়াসী হইলাম। রসুলের সাহাবী হজরত উবাই এর হস্ত লিখিত কোরানের কপিতে “তাঁহার স্ত্রীগণ তাহাদের মাতা” এই কথার সঙ্গেই উল্লেখ ছিল “এবং তিনি তাঁহাদের জন্য পিতা”। যদিও এই কথাটি আমাদের বর্তমান কোরানে তোলা হয় নাই। এই কথাটির প্রমাণ বহনকারী কয়েকটি পুস্তকের উল্লেখও দেখিতে পাওয়া যায়। ঐ সকল পুস্তকে রসুল এবং তাঁহার বংশধরের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ বাক্য কোরান সংকলনকালে বাদ দেওয়া হইয়াছে, এই জাতীয় কিছু কথা রসুল বংশীয় ইমামগণের উক্তি হইতেও আজও আমাদের শ্রুতি গোচর হইতেছে। এইসব বিষয়ও বোধ হয় আপত্তি উত্থাপনকারিগণ একেবারেই অবগত নহেন।
আলে মীম এবং আলে রাঃ- অর্থাৎ আলে মোহাম্মদ এবং আলে রসুল। কিন্তু রাজ দরবারের আলেম সমাজ আমাদিগকে পড়াইতে শিখাইয়াছেনঃ আলেফ লাম মীম এবং আলেফ লাম রা। এবং তাহারা ব্যাপকভাবে প্রচার করিয়াছেন যে, আল্লাহ্‌ ছাড়া এই সঙ্কেত গুলির অর্থ কেহ জানেন না। মানুষের জীবন দর্শনের নির্দেশ হইল কোরান। তাহলে মানুষের না জানার জন্য এই সংকেত গুলি কোরানে উল্লেখ করিয়াছেন কি? আসলে রসুল বংশের প্রতি দুশমনি করিয়া তাহাদিগকে চির দিনের জন্য তাঁহাদের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় সমাজ হইতে গোপন করার চেষ্টা করা হইয়াছিল। আবার আল্লাহ ছাড়া কেহই জানেন না বলিয়াই চুপ থাকেন নাই, বরং কাল্পনিক কয়েকটি মিথ্যা অর্থ আবিষ্কার করিয়া সজোরে ব্যক্ত করা হইতেছে, কিন্ত উহাদের সঙ্গে সত্য অর্থটিকে উপস্থিত রাখা হয় নাই। সেইরূপ রাখিলে পাঠকগণ নিজেরাই মিথ্যা হইতে সত্যটিকে বাছিয়া লইতে পারিত। কিন্তু সত্য একেবারে অনুপস্থিত রাখিয়া অনেক গুলি কাল্পনিক অর্থের মধ্যে পাঠকের মন হাতড়াইয়া বেড়াইবার জন্য এইরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নাই কি? আর কতকাল এই লুকোচুরির অবস্থা চলিতে থাকিবে জানি না।
কোরানের ছয়টি সূরা আরম্ভ হইয়াছে “আলে মোহাম্মদ” কথা দ্বারা এবং পাঁচটি সূরা আরম্ভ করা হইয়াছে “আলে রাসুল” কথা দ্বারা। ইহাদের অর্থ যথাক্রমে মোহাম্মদের বংশধর এবং রাসুলের বংশধর। কথা দুইটির ভাব প্রায় একরূপ হইলেও এর মধ্যে প্রভেদ আছে। “মোহাম্মদের বংশধর” প্রথম শ্রেণীয় এবং “রাসুলের বংশধর” হইলেন দ্বিতীয় শ্রেণীয়। সকল নবী, রসুল এবং ইমামুম্‌ মোবিনগণ হইলেন মোহাম্মদের বংশধর। এবং ইহাঁদের যাহারা বংশধর তাঁহারা হইলেন “আলে রাসুল” রাসুলের বংশধর বা পুত্রগণ। অবশ্য এই উভয় বংশধরই হইলেন “আলোপ্রাপ্ত বংশধর” রক্তগত দৈহিক বংশধর নয়। অক্ষর তিনটির উপর দুইটি দীর্ঘ মদ স্থাপন করাতে ইহার অর্থ হইয়াছেঃ অনন্ত মোহাম্মদের অনন্ত বংশধর। এই বিষয়ে পাঠকগণকে অনুরোধ করিব আমার লিখিত “কোরানের হাকিমের সাঙ্কেতিক অক্ষর সমূহের পরিচয়” নামক পুস্তকটি এক নজর দেখিয়া লইতে।
তৌহিদ বিষয়ে একটি কথা উল্লেখের পর কোরানের উক্ত বাক্যটি সহ আরও কয়েকটি বাক্যের ব্যাখ্যা বা সংক্ষিপ্ত একটি বিশ্লেষণ দিবার চেষ্টা করিলাম।
তৌহিদঃ

স্রষ্টা ও সৃষ্টি বলিয়া আলাদা কিছু নাই। সকল এক অখণ্ড অস্তিত্বের বিকাশ। দ্বৈতবাদ বা দ্বৈত অস্তিত্ব মিথ্যা হইলেও আপাত ভাবে ইহাকে স্বীকার করিয়া লইতে হয় সঙ্কীর্ণ অবোধ মনের প্রাথমিক অবস্থার কারণে। তৌহিদ জ্ঞান পরিস্ফুট হইলে “আমি তুমি” বা “স্রষ্টা সৃষ্টি” আলাদা আর থাকে না। সালাত ব্যতীত এই জ্ঞান রাজ্যে যাওয়া যায় না। এই কারনেই কোরানে বলিয়াছেনঃ “তোমরা আল্লাহ্‌র জন্য (সালাতে) দাঁড়াও প্রথমত জোড়ায় জোড়ায় তারপর একা একা (৩৪:৪৬).” ফারদানিয়াতের মঞ্জিলে অর্থাৎ মনের তৌহিদ মঞ্জিলে না পৌঁছা পর্যন্ত আপন গুরুকে ক্বেবলা করিয়া তাহাকে হাজির নাজির জানিয়া সালাত পালন করিতে হয়। গুরু ভজনের ফলশ্রুতি হিসাবে পরবর্তী পর্যায়ে গুরু নিজে সরিয়া যাইয়া শিষ্যকে “ফারদিনিয়াতের” মঞ্জিলে একাকীত্বের মধ্যে তৌহিদ ভাবের চরম সত্য দৃষ্টি দান করেন। তখন শিষ্য নিতান্তই একাকী হইয়া যান। এখানে তাঁহার তৌহিদ। এখানেই গুরু শিষ্য একাকার।
দ্বৈত ভাবের মধ্যে ধর্ম। ধর্ম জগতেই মতভেদের গোলযোগ। ধর্ম জগত মোমিনের নিয়ন্ত্রণে থাকিলে সমাজ জীবনে প্রকৃত শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। অদ্বৈতে কোন ধর্ম নাই—আছে আহাদ অবস্থা, আছে তৌহিদ অবস্থা বা লা- অবস্থা।
আল্লাহ্‌কে যাহারা শুধুই নিরাকার রূপে কল্পনা করিয়া সপ্ত আকাশের উপর মহাশূন্যে স্থাপন করিয়া থাকে তাহারাই প্রকৃতই মোশরেক এবং অজ্ঞান। আল্লাহর আহাদ রূপের তৌহিদ জ্ঞান তাহাদের ভাগ্যে কখনও জুটিবনা, যতকাল বহুর মধ্যে একের প্রকাশ তাহারা সজ্ঞানে গ্রহণ না করিবে। আল্লাহ্‌র স্বরূপকে একক মনে না করিয়া তাঁহাকে এক মানিলেই তৌহিদ হয়না। তৌহিদ জ্ঞান অর্থাৎ অদ্বৈত জ্ঞান এত সহজ বিষয় নয়। এক নিরাকার আল্লাহ্‌ মানিলেই তৌহিদ জ্ঞান হইত তবে এদেশের "আহলে হাদিস"গণ সবাই মহা জ্ঞানের অধিকারী হইত। অথচ দেখা যায় ধর্ম জ্ঞানে তাহারা একেবারেই হীন পর্যায়ভুক্ত। তাহারা শক্ত দ্বৈতবাদী।
অনুবাদঃ-(৩:৮১) এবং যখন আল্লাহ্‌ নবীদের মিশাক (প্রতিশ্রুতি) গ্রহণ করিলেনঃ- “অবশ্য যাহা আমি একটি কেতাব হইতে এবং একটি হেকমত হইতে তোমাদিগকে দিয়াছি---অতপঃর তোমাদের নিকট আসিলেন একজন রসুলঃ তিনি সত্যায়িত করিলেন তোমাদের নিকট যাহা আছে। অবশ্য করিয়া তাঁহাতে ঈমান স্থাপন কর এবং অবশ্য করিয়া তাঁহাকে সাহায্য কর।” (আল্লাহ্‌) বলিলেনঃ তাহা হইলে (এই বিষয়ে) সাক্ষী রহিলাম।
ব্যাখ্যাঃ- মহানবীর আগমনের পর সকল নবীগণকে একত্র করিয়া আল্লাহ্‌ তাঁহাদের নিকট হইতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিলেন যেন তাঁহারা মহানবীর আনুগত্য গ্রহণে প্রতিশ্রুতি হইয়া তাঁহাকে সাহায্য করেন। তাঁহাদের আনুগত্যের প্রস্তাব আল্লাহ্‌ নিম্নরূপে তাঁহাদের নিকট পেশ করিতেছেন। আল্লাহ্‌ তাঁহাদিগকে বলিলেনঃ-
যাহা কিছু আমি একটি কেতাব ও একটি হেকমত হইতে তোমাদিগকে দিয়াছি তারপর তোমাদের নিকট আসিলেন একজন রসুল (অর্থাৎ মহানবী)। তিনি সত্যায়িত করিলেন তোমাদের নিকট একটি কেতাব ও একটি হেকমত হইতে যে জ্ঞান তোমরা লাভ করিয়াছ।*১ এখন আরও উন্নত পর্যায় লাভ করার জন্য অবশ্য করিয়া তাঁহাদের ঈমান স্থাপন কর। তাঁহার শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করিয়া নিজ জীবন এবং সমাজ জীবনকে আরও মহীয়ান করিয়া তোল, এবং তাঁহার প্রচার কার্যে তাঁহাকে সাহায্য কর।” ইহাতে নবীগণ নিরুত্তর হইয়া থাকার কারণে আল্লাহ্‌ জিজ্ঞাসা করিলেনঃ-“তোমরা কি প্রতিশ্রুতি হইলে? এবং গ্রহণ করিলে কি আমার দায়িত্ব উহার উপরে?” (অর্থাৎ নূরে মোহাম্মদির কর্তব্য পালনের ভার আমাওর পক্ষ হইয়া রাজী হইলেন কি?)*২

টীকাভাষ্যঃ
*১. মহানবীর যে জ্ঞান তাহা সকল নবীদের সমষ্টিগত জ্ঞানের বহু ঊর্ধ্বে। এই কারণেই প্রত্যেক নবী তাঁহার আপন কেতাব ও হেকমত হইতে আত্মার যে জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন তাহা সত্যায়িত করিবার অধিকারী হইলেন তিনি। এইরূপে আত্মিক চরম উৎকর্ষ লাভের জন্য সকল নবীগণ তাঁহাকে প্রভু গুরুরূপে গ্রহণ করিয়া তাঁহার শিষ্য হইলেন এবং তাঁহার পুত্র স্থানীয় মর্যাদা প্রাপ্ত হইলেন। একটি কেতাব অর্থ আপন দেহ ও উহার কর্মকাণ্ড। এবং একটি হেকমত অর্থ মানসিক অনুপ্রবেশ দ্বারা আত্মিক জ্ঞান লাভের যে প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় তাহাকে একটি হেকমত বলা হইয়াছে।
*২ নূরে মোহাম্মদি প্রকাশের দায়িত্ব গ্রহণ করা বিষয়টি জীবনের বিনিময়ে সম্পাদন করিতে হয়। দুনিয়ার মানুষ সর্বদাই এর ঘোর বিরোধিতা করিয়া থাকে। তাহাদেরকে আল্লাহমুখি করিতে গেলে বহু প্রকার দুর্ভোগের শিকার হইতে হয়। এই গুরুত্ব অনুধাবন করিয়াই নবীগণ নিরুত্তর ছিলেন। এইবার তাঁহারা বিপদজনক এইবার তাঁহারা বিপদজনক এই গুরুভার বহনে সম্মত হইলেন।

অনুবাদ(৩৩:৭+৮) এবং যখন আমরা নবীগণ হইতে তাঁহাদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিলাম, এবং তোমা হইতে তাঁহাদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিলাম এবং তোমা হইতে এবং নূহ হইতে এবং ইব্রাহীম হইতে এবং মুসা হইতে এবং মরিময় নন্দন ঈসা হইতে। এবং তাহাদিগ হইতে আমরা গ্রহণ করিলাম শক্ত (বা গলিজ) একটি প্রতিশ্রুতি।
যেন তিনি সাদেকদিগকে তাঁহাদের সাদেকি বিষয়ে প্রশ্ন করেন (অথবা—সাদেকগণের হইতে তাঁহাদের সাদেকির প্রমাণ চাহিয়া লওয়ার জন্য)। এবং কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হইয়াছে কষ্টদায়ক একটি আজাব।
ব্যাখ্যাঃ(৩৩ঃ৭+৮) নুরমোহাম্মদ উচ্চতম পরিষদের পক্ষ হইয়া বলিতেছেনঃ “আমরা নবীগণ হইতে তাঁহাদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিলাম এবং প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিলাম তোমা (অর্থাৎ তুমি মোহাম্মদ হইতে) এবং নূহ হইতে এবং এবং ইব্রাহীম হইতে এবং মুসা হইতে এবং মরিময় নন্দন ঈসা হইতে। এবং তাহাদিগ হইতে আমরা গ্রহণ করিলাম শক্ত (বা গলিজ) একটি প্রতিশ্রুতি।”
প্রতিশ্রুতির বিশেষণটির আরবী হইল “গালিজ”। ইহার অর্থ নোংড়া, অবাঞ্ছিত এবং শক্ত। এর কারণ আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি রূপে আল্লাহ্‌র পথের হেদায়েত দান করা বিষয়টি সম্পাদন করিতে গেলে নোংরা পরিস্থিতির মধ্যে পড়িয়া যাইতে হয়। দুনিয়াবাসি কখনও সত্যের পথচারী নয়।
সুতরাং সত্যের প্রচারকগণ যে সকল অবাঞ্ছিত সামাজিক নোংরা পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তাহাতে তাঁহাদের প্রতিশ্রুতির সত্যতা রক্ষা করা কঠিন এবং কষ্টকর একটা পরীক্ষামূলক বিষয় হইয়া দাঁড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নোংরা পরিস্থিতির নিকট জীবন উৎসর্গ করিতে হয়। অবশ্য ইহার প্রতিফল স্বরূপ কাফেররা বড় রকমের আজাব ভোগ করিয়া থাকে। এই প্রসঙ্গে একটি মূল্যবান তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন মনে করি। মহানবীর আনুগত্য গ্রহণ করা ব্যতীত কোন নবীর জন্যও লা মোকামে উন্নতি হওয়া—অর্থাৎ আল্লাহ্‌র উচ্চতম পরিষদের সদস্য হওয়া সম্ভব ছিল না। মহানবীর আগমনের পর অর্থাৎ সশরীররে প্রকাশিত হওয়ার পর সকল নবীগণ রহস্যলোকে থাকিয়া আত্মিক ভাবে সাধকগণের মনে নুরেমোহাম্মদি জাগ্রত করিয়া তোলার কাজে মহানবীর সহায়ক হইয়া আছেন।
“উলিল আজম নবীগণ” অর্থাৎ উচ্চতম পর্যায়ে নবীগণ মহানবীর সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াই আমরা দলের সদস্য হইতে পারিয়াছেন। তাঁহার আগমনের পর এখন তাঁহারা আমাদের চক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া মোহাম্মদি শান সাধক মনে প্রকাশ করার কাজে আত্মনিয়োগ করিয়া তাঁহার প্রতি আনুগত্যের কর্তব্য পালন করিতেছেন। তাঁহার আগমনের পরবর্তী অলিগণ সরাসরি ভাবে তাঁহার আশীর্বাদ প্রাপ্ত হইয়া উচ্চতম পরিষদের তথা মোকামে মাহমুদার সদস্য হইতে পারিতেছেন।
আমাদের আরবি শিক্ষিত পণ্ডিতগণ তাঁহাকে যত খাট দেখাইতে চেষ্টা করুন না কেন, মহানবী প্রকৃতই যে, সকল নবীর সরদার, উপরে উল্লেখিত বাক্যে তিনটি তাহার যথেষ্ট প্রমাণ বহন করে।

মহাকাল অখণ্ড এক এবং তাহা শুধুই বর্তমান। অতীত এবং ভবিষ্যৎ বলিয়া কিছুই নাই। সময়কে কোরানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিন ভাগে ভাগ করেন নাই। তথাপি তফসিরকারকগণ জান্নাত, জাহান্নাম, বিচার দিবস ইত্যাদি বিষয়ে আপন ভাবদর্শন অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কাল ব্যবহার করেন। এর ফলে কোরানিক দর্শনের প্রকাশ অত্যন্ত বিপর্যস্ত হইয়া পড়ে। হাদিস কুদসিতে আল্লাহ্‌ সময় সম্বন্ধে বলিতেছেনঃ “সময় আমি”। আল্লাহ্‌ নিজেই কাল; তাহা হইলে কালকে তিন বা ততোধিক খণ্ডে কেমন করিয়া ভাগ করা যায়? আল্লাহ্‌ কি অবিভাজ্য নহেন?
আমরা সীমিত জ্ঞান বিশিষ্ট একপ্রকার সীমিত মানুষ। তাই কালকে আমরা প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করিয়া সব কিছু বুঝিবার চেষ্টা করি। এই সব বিষয় চিন্তা না করিয়াই কোরানের কথার গোঁজামিল দেওয়ার জন্য মনগড়া একটি আবিস্কৃতি কথা হইল “আলমে আরওয়া”। আলমে আরওয়া কথাটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। মহানবীর প্রতি নবীদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা বিষয়টি ঘটিয়াছিল বলা হইয়া থাকে আলমে আরওয়াতে অর্থাৎ “রুহের জগত”।
মহানবীর ঔরশে পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করা সত্ত্বেও কোরানে দৃঢ়তার সহিত জানাইতেছেন যে, “মোহাম্মদ তোমাদের কোন মানুষের পিতা নহেন বরং তিনি আল্লাহ্‌র রসুল”। তাঁহার প্রথম স্ত্রীর প্রথম সন্তান ছিলেন হযরত কাশেম, যে কারণে মহানবীকে “আবুল কাশেম” বলা হইয়া থাকে। তাঁহার জীবনে অন্তিম অবস্থায় তাঁহার শেষ পুত্র সন্তান হযরত ইব্রাহীম দেহ ত্যাগ করেন। এই পুত্র উপস্থিত থাকা কোরানে বলা হইতেছেঃ “মোহাম্মদ তোমাদিগের কোন রেজালের পিতা নহেন”। এখানে রেজাল অর্থ মানুষ বা মনুষ্য জাতি। যেমন ইংরেজিতে Man কথা দ্বারা মনুষ্য জাতিও বুঝায়।
তিনি ত্রত উন্নত মানের এক অস্তিত্ব যে, তিনি আমাদের মত মানবীয় ভাবের কোন মানুষের পিতা নহেন। বরং তিনি নবী, রসুল ও ইমামগণের পিতা নহেন। তাহাও আবার দৈহিক পিতা নহেন—নূরের পিতা। আমাদের মন মানসিকতার সঙ্গে দেহ সম্পর্ক যুক্ত থাকে অর্থাৎ শরীক হইয়াই থাকে, কিন্তু তিনি ইহার বহু বহু ঊর্ধ্বে। এইসব মৌলিক কথা না বুঝিয়াই যাহারা কোরানের কথার উপর সিদ্ধান্ত দান করেন তাহারা স্বভাবই গোলযোগ সৃষ্টিকারীর ভূমিকা পালন করিয়া থাকেন।
তিনি “খাতামান্নাবি” অর্থাৎ শেষ নবী, শিলমোহর যুক্ত বা সীলমোহরের দাতা সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। কিন্তু সবার উপরে ইহাতে যে ভাবটি বহন করে তাহা হইল “তিনি নবীগণের নবুয়তের সীলমোহর দানকারি—তথা সকল নবীদের নবুয়ত সত্যায়নকারি।” আল্লাহ্‌র একমাত্র খলিফা অর্থাৎ প্রতিনিধিরূপে তিনিই নবিগনকে তাঁহার আপন নূর বিতরণের প্রতিনিধিত্ব দান করিয়া এবং তাহা দ্বারাই আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি বানাইয়া লইয়াছেন। নবুয়ত শেষ হওয়ার পর রেসালাত, বেলায়েত ও ইমামত নামে তাঁহার প্রতিনিধিত্ব চলিতেই থাকিবে।
সবার শেষে আমি বলিতে চাই যে, পরম সত্য এই ত্রিত্ববাদ সর্ব সাধারণের জন্য হয় নাই। যাহাদের ধর্ম বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান হয় নাই ইহা তাহাদের জন্য নয়। ধর্মজ্ঞানে যাহারা বহুদূর আগাইয়া গিয়াছেন ইহা তাহাদের জন্যই প্রকাশ করা হইয়াছে। সুক্ষ্ম বিষয় ভাষায় বুঝাইয়া দেওয়া সম্ভব নয়। সেইরূপ হইলে বিজ্ঞানময় কোরান নিজেই তো সত্যের সর্বোত্তম ভাষাগত প্রকাশ। কোরান পড়িয়াই কি মানুষ মহৎ হইতে পারিয়াছে? না ইহা বুঝিয়াছে? ফের বলছিঃ কোরান একটি জীবন বিধান নয়, ইহা জীবন দর্শন। জ্ঞানীগণ এই দর্শন হইতে যাহাই বলিবেন অথবা করিবেন তাহাই মানুষের জন্য জীবন বিধান। কোরানে বলিতেছেনঃ যাহারা আল্লাহ্‌ এবং রসুলের মধ্যে ফরক করার ইচ্ছা করে তাহারা সত্য সত্যি কাফের (৪:১৫০-১৫২)।

মোহাম্মদের আ. শ্রেষ্ঠত্ব এত চরম ও পরম যে, তিনি বস্তুগত স্বম্বন্ধ হইতে আপন মন মানসিকতা এমন ভাবে সরাইয়া থাকেন বা বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছেন যে, তিনি দেহগত ভাবে কাহারও পিতা নহেন। তিনি স্থুল পিতা নহেন, পরম পিতা। বিষয় বস্তুগত পিতা নহেন বরং আল্লাহ্‌র নূর বিতরণকারী বা বিচ্ছুরনকারী সেই মহানূরের পিতা, তাই তিনি “পরম পিতা”। তিনি বস্তু নূরের কেহ নহেন তাই তিনি দৃশ্যত, বাহ্যিক এবং তাঁহার জন্য মিথ্যা পৈত্রিক সম্বন্ধ তিনি নিজেই ত্যাগ করিয়া বা ঝাড়িয়া ফেলিয়া তিনি সকল মানুষের জন্য একটি সুক্ষ্ম আদর্শ দেখাইয়া গেলেন যে, বস্তুগত পিতৃত্ব আমাদের মন হইতেও ঝাড়িয়া ফেলা উচিৎ। “তিনি কোন মানুষের পিতা নহেন বরং তিনি আল্লাহ্‌র রসুল।” অর্থাৎ আল্লাহ্‌র পরম পিতৃত্ব দানকারী “পরম পিতা” পাক পাঞ্জাতনের পিতা। তিনি ব্যতীত কাহারও মনের মধ্যে সেই মহানুরের জন্মদাতা আর কেহই নাই, কারণ সেই মহা নূরের আদিপিতা এবং পরম পিতা তিনি। তাঁহার অনুমোদন ব্যতীত কেহই উহা দান করিতে পারেন না। তাই তিনি আল্লাহ্‌র প্রতিনিধিত্ব বহনকারী “আল্লাহ্‌র রসুল”। অন্য কোন নবীর প্রতিনিধিত্ব বহনকারী আল্লাহ্‌র রসুল নহেন। অপর পক্ষে অন্যান্য সকল নবী ও রসুলগণ আল্লাহ্‌ এবং মোহাম্মদের (আ.) প্রতিনিধিত্ব বহনকারী নবী অথবা রসুল।
মোমিনগণ দুনিয়াবাসি থাকেন না। তাঁহারা “আখেরাতবাসি অর্থাৎ আল্লাহ্‌র দ্বীনের অধিবাসী হইয়া থাকেন। দুনিয়াবাসিদের প্রতি আল্লাহ্‌ তাঁহার দাতব্য দানগুলি গায়েবে থাকিয়া দয়াল দাতা রহমান রূপে দান করিয়া থাকেন। আর আখেরাতে অর্থাৎ তাঁহার দ্বীনের মধ্যে দয়াল দাতা রহিম রূপে দান করিয়া থাকেন। কোরানে বলিতেছেনঃ রসুলাল্লাহ হইলেন “বিল মোমেনিনা রাউফুর রাহিম (৯:১২৮)” অর্থাৎ মোমিনগণের সঙ্গে তিনি দয়া বিগলিত (দাতা) রহিমরূপে আছেন।
এইরূপে আল্লাহতালার পরম পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব উভয় ভূমিকা বাস্তবে পালনকারী তিনিই। নিরাকার আল্লাহ্‌র সকল রাজত্ব তাঁহারই হাতে। তিনি জাহেরে ও বাতেনে আল্লাহর বাস্তব ভূমিকা পালনকারী আমাদের পিতা ও মাতা।
“আল্লাহুমা সাল্লে আলা মোহাম্মদ ওয়া আলে মোহাম্মদ” অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তাঁহার সমগ্র অস্তিত্ব (সহকারে) মোহাম্মদ ও তাঁহার আলের (অর্থাৎ নূরের বংশধরের) উপর সালাত করেন। (অর্থাৎ স্মরণ ও সংযোগ ক্রিয়া সম্পাদন করেন)।
ত্রিত্ববাদ নিবন্ধে জিবাত্মার জন্য জন্মান্তরের আবর্তে যেরূপ ইঙ্গিত বা উল্লেখ আছে তাহাতেও অধিকাংশ আরবি পণ্ডিত ব্যক্তিগণের আপত্তির আওয়াজ উঠিবে। এর কারণ তাহারা কোরানের কোথাও নাকি পুনজন্মবাদের কোন উক্তি খুঁজিয়া পান না। যে পুনজন্মবাদের ভিত্তির উপর সমগ্র কোরানের জীবন দর্শনের অঙ্কিত রহিয়াছে তাহা অস্বীকার করিয়া কোরান বুঝিতে চেষ্টা করিলে কেমন করিয়া তাহা সম্ভবপর করিয়া কোরান বুঝিতে চেষ্টা করিলে কেমন করিয়া তাহা সম্ভবপর হইবে তাহাও বলা দুষ্কর।

~ সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী

Comments

Popular Posts