কেতাব


"কেতাব" অর্থ মানব দেহ। আল-কেতাব অর্থ বিশিষ্ট বা প্রতিষ্ঠিত মানবদেহ বা মহামানব। আল কেতাব হইতে কোরান আগত। কোরান, বাইবেল ইত্যাদি আল কেতাবের অংশ (৪:৪৪,৫১)। যাহারা আল-কেতাব প্রাপ্ত হন তাঁহারা জানেন যে, এই মহাজ্ঞান মানুষের অভ্যন্তরীণ আপন রব হইতে আগত। সুতরাং মানুষের উচিত তাহারা যেন নিঃসন্দেহে এই জাতীয় মহাপুরুষদের অনুসরণ করে। “কেতাব’’ কথা দ্বারা কোরান, ইঞ্জিল, তোরাত ইত্যাদি কোন ধর্মগ্রন্থ বুঝায় না। ইহা সৃষ্টি রহস্যের মৌলিক জ্ঞান। ধর্মগ্রন্থগুলি কেতাবের পরিচয়দাতা বাক্যাবলী। এইজন্য কোরানে দেখিতে পাওয়া যায় তিন দিনের শিশু ঈসা (আঃ) বলিতেছেন, “আমি কেতাব প্রাপ্ত।” রসুলাল্লাহ (আঃ) শুধু জন্ম হইতে নহে, জন্মের পূর্ব হইতে কেতাবপ্রাপ্ত। কোরান তাঁহার দিকে অহি হইতে আরম্ভ হইয়াছিল ৪০ বৎসর বয়সে।নূরে মোহাম্মদীর মাধ্যমে বিচিত্র সৃষ্টিরূপে স্রষ্টার বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। উচ্চমানের বিশিষ্ট সাধকের উপর কেতাব জ্ঞান নাজেল হওয়া বিষয়টি সর্বকালের একটি চিরন্তন ব্যবস্থা। কেতাব হইল বিশ্ব প্রকৃতির সামগ্রিক বিকাশ-বিজ্ঞান। মানুষের জন্য আল্লাহ্‌র জীবনবিধানও কেতাবের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ্‌র বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। যেই যন্ত্রের মধ্যে বা যেই সকল রূপের মধ্যে আল্লাহ্‌র উক্ত বিজ্ঞানময় বিকাশ ঘটে তাহার মধ্যে মানব দেহ সর্বশ্রেষ্ঠ। এইজন্য মানব দেহকে “আল কেতাব’’ বলা হইয়াছে। আল কেতাবের জাহের রূপ “মানব দেহ’’ এবং বাতেন প্রক্রিয়া ‘বিকাশ বিজ্ঞান’. আল কেতাবের উভয় প্রকার বিকাশের মূল উৎস নূর মোহাম্মদ। ‘আল কেতাব পাঠ করা’ অর্থ আপন দেহ পাঠ করা তথা আপন দেহের মধ্যে আত্মদর্শনের অনুশীলন করা। আপন দেহই সকল জ্ঞানের মূল উৎস। সহজ কথায় কেতাব অর্থ মানব দেহ। আল-কেতাব অর্থ বিশিষ্ট মানব দেহ বা সিদ্ধপুরুষ অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত একজন মহাপুরুষ। আল-কেতাব হইতে ধর্মগ্রন্থ সমূহের আগমন।  

 "#আল_কেতাব'' দর্শন করিবার বিষয়। মহাপুরুষগগণ হইতে যে বাণী আসে তাহা তাঁহাদের আল_কেতাবের বাণী। এই বাণী কাগজেকলমে লিখার বিষয়টি প্রয়োজনীয় হইলেও কেতাব দর্শন ক্রিয়া হইতে গৌণ। যাহারা ইহাকে মুখ্য বিষয়রূপে গণ্য করে অথচ নিজেরা আত্মদর্শন করে না তাহারা ইহা দ্বারা নিজেদের দুঃখই উৎপাদন করে যদিও ইহা দ্বারা দুনিয়া প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়।এখানে আত্মদর্শনমূলক প্রচারকে প্রাধান্য দেওয়া হইতেছে, তাই যাহারা আত্মদর্শন ব্যতীত আল্লাহর বাণী শুধু লৈখিক প্রচারে ব্যস্ত তাহারা সমাজ এবং নিজেদের জন্যই শুধু দুঃখ আনয়ন করে (দ্র. ২ঃ৭৯)।

'কেতাব' সংক্রান্ত আলকোরানের বানীসমূহঃ
অনুবাদঃ (২:১-২)--- আলিফ লাম মীম অথবা, আলে মীম বা মোহাম্মদ, উহা আল কেতাব, নাই তাহাতে সন্দেহের কোন অবকাশ-- উহা একটি হেদায়েত মোত্তাকিনদের (কর্তব্যপরায়ণদের) জন্য...
ব্যাখ্যাঃ 'আলিফ' অর্থ আমি বা স্বয়ং। 'লাম' অক্ষরে বুঝায় লা-অবস্থা বা নাই অবস্থা। লাম-এর উপরে বড় মদ থাকার কারণে অসীমভাবে বা অবিরামভাবে না বুঝায়। বড় মদ সহ মীম অক্ষর দ্বারা বুঝায় অনন্ত মোহাম্মদ। সুতরাং ব্যক্তি সত্তার আমিত্ব অসীমভাবে লয়প্রাপ্ত হইলে সেই সত্তা মোহাম্মদে পরিণত হয় এবং অখণ্ড অসীমত্ব লাভ করে।
অথবা---- আলে মীম অর্থ অনন্ত মোহাম্মদের অনন্ত বংশধর। আল অর্থ বংশধর, মীম অর্থ মোহাম্মদ। 'আল ও মীম' এর উপর বড় মদ থাকার কারণে বুঝায় অনন্ত মোহাম্মদের অনন্ত বংশধর। 'মীম' এর উপর তসদীদ থাকিবার কারণে বুঝায় পুনঃ পুনঃ বিকাশ। এইরূপে মোহাম্মদ হইয়াছেন তাঁহার আলের মাধ্যমে সর্বজনীন এবং সর্বকালীন। রসুল বলিয়াছেনঃ “আউয়ালুনা মোহাম্মদ, আখেরুনা মোহাম্মদ, আওসাতুনা মোহাম্মদ, কুল্লানা মোহাম্মদ।” অর্থাৎ আমাদের আদি মোহাম্মদ, আমাদের শেষে মোহাম্মদ, আমাদের মধ্য হইল মোহাম্মদ, আমাদের সবাই মোহাম্মদ। অর্থাৎ আদি অন্ত মধ্য সর্বকালেই মোহাম্মদরূপে আমরা বিরাজিত আছি।
মোহাম্মদের বংশধর বলিতে রক্তের বংশধর বুঝায় না বরং গুণের বংশধর বুঝায়। মানবীয় আমিত্বের অবসান দ্বারা উৎপন্ন হয় মোহাম্মদী অবস্থা। 
স্রষ্টার বিকাশ বিজ্ঞানকে কেতাব বলে। স্রষ্টার সকল প্রকার বিকাশ বিজ্ঞানের মধ্যে অর্থাৎ তাঁহার কেতাবসমূহের মধ্যে মোহাম্মদ আ. বংশধর হইলেন বিশিষ্ট একটি মহান কেতাব।
'আল কেতাব' অর্থ প্রতিষ্ঠিত মানবদেহ। ঐরূপ ব্যক্তি হইতে সন্দেহ বা অস্পষ্টতা বা অজ্ঞানতা দূর হইয়া গিয়াছে। সুতরাং তাঁহারাই মোত্তাকীদের জন্য হেদায়েতদাতা গুরু।
(২:৫৩) এবং যখন আমরা মুসাকে দান করিলাম আল কেতাব ও ফোরকান যেন তোমরা হেদায়েত গ্রহণ কর।
ব্যাখ্যাঃ 'আল কেতাব' অর্থ প্রতিষ্ঠিত কেতাব, তথা প্রতিষ্ঠিত মানব দেহ যাহা আত্মদর্শনের সাহায্যে জ্ঞানে গরিমায় সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়। 'ফুরকান' অর্থ সর্ববিষয়ের ভাল-মন্দ প্রভেদ জ্ঞান বা বিচার জ্ঞান। উভয় প্রকার দান পরস্পর সম্পূরক। আত্মদর্শন ও ফুরকান জ্ঞান অর্জন ব্যতীত মানুষের সত্যিকার হাদি হওয়া যায় না। নিজে দ্রষ্টা না হইয়া অন্যকে দ্রষ্টা বানানো যায় না।
টীকাভাষ্যঃ ফুরকান- ইহা উচ্চমানের সৃষ্টি রহস্যের জ্ঞান বিশেষ। বস্তুজগত, ভাবজগত এবং কর্মজগতের সর্বপ্রকার ভাল-মন্দ বিচার করিবার মত উচ্চমানের এক প্রকার যোগ্যতাকে ফোরকান বলে। কোরানের অপর নাম ফোরকান নহে। এইরূপ ধারণা ভ্রান্ত। 'ফরক' শব্দ হইতে ফোরকান, অর্থাৎ প্রভেদকারী জ্ঞান। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, শের্ক-তৌহিদ ইত্যাদি সবকিছুর ফরককারী বা প্রভেদ নির্ণয়কারী মহাজ্ঞানকে ফোরকান বলে। ফোরকান সর্বযুগেই খাস ব্যক্তির উপর নাজেল হইতেছে(৮:২৯)।  

★ প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি তাঁহার দাসের উপর নাজেল করিয়াছেন কেতাব এবং তাহার জন্য (অর্থাৎ সেই দাসের জন্য) রাখেন নাই কোনও বক্রতা ;
★ (তাহাকে অথবা ইহাকে) করিয়াছেন দণ্ডায়মান (বা প্রতিষ্ঠিত) তাহা ইহাতে আগত কঠিন একটি যুদ্ধ বিষয়ে সাবধান করিয়া দেওয়ার জন্য এবং সৎ আমলকারী মোমিনদিগকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য যে, তাহাদের জন্য একটি সুন্দর পুরষ্কার রহিয়াছে,★ যাহাতে তাহারা থাকিবে তাহা একটি (স্থায়ী) জীবনকাল, (১৮:১-৩)

#ব্যাখ্যা(১-৩): আল্লাহর গুণাবলীর বহিঃপ্রকাশ এই সৃষ্টি। যে মহাবিজ্ঞানময় নিয়মে সৃষ্টি প্রকাশিত হইতেছে তাহাকে 'কেতাব ' বলে। যে মহান দাসগণের উপর কেতাবজ্ঞান নাজেল হয় তাহারা সত্য ও সরল জীবনের অধিকারী হইয়া থাকেন। তাঁহাদের মন হইতে সকল প্রকার বক্রতা বা ভ্রান্তির অবসান ঘটে। তাঁহারাই কেবল আল্লাহর প্রশংসা বুঝিতে সক্ষম। তাঁহারা সৃষ্টিতে সকল প্রকার দাসত্ব হইতে মুক্ত হইয়া আল্লাহর দাসত্বের উপর দৃঢ়ভাবে দণ্ডায়মান হন। তাঁহারাই লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিরঞ্জীব সৃষ্টি। ফানার জগতের সকল সৃষ্টির অধীনতা হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং বাকার জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত মহান ব্যক্তিত্ব ইঁহারাই। মহানবী তেমনই একজন দাস যিনি মানবরূপে আসিয়াছেন লোকদিগকে সজাগ করিয়া তাহাদের জীবনের কঠিন একটি যুদ্ধ বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার জন্য যাহাতে বিশ্বাসকারীগণ সাবধানতার সহিত বস্তুবন্ধনের সকল কলুষ হইতে মুক্ত হইয়া স্বাধীন সত্ত্বারূপে সুপ্রতিষ্ঠিত হইতে পারেন, এবং সুন্দর পুরষ্কার লাভ করিতে পারেন, এবং এমন একটি জীবনকালে পৌঁছাতে পারেন ---যাহা চিরস্থায়ী।


★ হে ইয়াহিয়া, সবলে কেতাবকে ধর। এবং তাহাকে আমরা দান করিয়াছিলাম (বাল্যাবস্থায়) যথাযোগ্য একটি হুকুমত জ্ঞান, [*1]
★ এবং আমাদিগকে হইতে কোমলতা ও পবিত্রতা (বা জাকাত)। এবং সে ছিল মোত্তাকী, (১৯:১২+১৩) 
#টীকাভাষ্য :*1. '#হুকুম ' কথা দ্বারা বিচারজ্ঞান এবং সামাজিক শাসন পরিচালনার যোগ্যতা এবং শাসন পরিচালনা অধিকারের বিষয় বুঝায়।

#ব্যাখ্যা (১৯:১২+১৩) : ইয়াহিয়া জন্মগ্রহণ করিবার পর বাল্যকালেই তাঁহার নিকট নির্দেশ আসিল, "হে ইয়াহিয়া, কেতাবকে শক্তি সহকারে ধর।" কেতাব অর্থ কোনও ধর্মগ্রন্থ নয়। উহা আল্লাহর বিকাশ বিজ্ঞান। এইরূপ বলিবার উদ্দেশ্য হইল, চিত্তবৃত্তির পরিপূর্ণ বিকাশের পূর্বে বাল্যাবস্থায় কেতাব ও হেকমতপ্রাপ্ত হইলে উহার জন্য উপযুক্ত দৃঢ় মনোবল রক্ষা করিয়া চলা বালকের পক্ষে পূর্নবয়স্ক ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক কঠিন ব্যাপার। তাই বোধ হয় বাল্যাবস্থার জন্যই এইরূপ ভাষায় চারিত্রিক দৃঢ়তা অবলম্বন করিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। তাহা ছাড়া উচ্চতম পরিষদের ব্যক্তিগণের কোমলতা এবং পবিত্রতা বা উৎসর্গগুণও তাঁহাকে দান করা হইয়াছিল। তিনি এই সকল অপূর্ণ অর্থাৎ একজন বালক।যাহা হউক, মহাপুরুষগণের চরিত্রের দুইটি গুণ : হানানান ও জাকাতান। ইহাদ্বারা তিনি হইয়া উঠিলেন স্বয়ং তাকওয়ার একটি মূর্ত প্রতীক।

 #হানানান : ইহা মনের গোলযোগশূন্য একটি প্রশান্ত ভাব। বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে কার্যকারণের কোন গোলযোগ নাই। সৃষ্টির প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থানে সঠিকভাবেই আছে। মনের এই জ্ঞানময় ভাবটির নাম হানানান। অতএব, যাঁহার মধ্যে এই হানানান চলে আসে তাঁহার মধ্যে কোমলতা ইত্যাদি সদগুণ প্রকাশ পায়। সেই ব্যক্তি তখন তাকওয়ার একটি মূর্ত প্রতীক হইয়া উঠেন। মনে হয় তিনি স্বয়ং একটি তাকওয়া।

* (একটি কোরান) একটি কেতাবের মধ্যে সুরক্ষিত রহিয়াছে,                                              
*পবিত্রগণ ব্যতীত উহা কেহই স্পর্শ করেনা (৫৬:৭৮+৭৯)
ব্যাখ্যাঃ চিত্তাকাশে ‘জঞ্জালের উদয়-বিলয়’ এর অবসান ক্রিয়া সম্পন্ন করাই কোরান। এইরূপ পরিশুদ্ধ মনই কেরামত-ওয়ালা সম্মানিত একটি কোরান। কোরান কেতাব হইতে আগত এবং কেতাবের একটি অংশ(৪:৪৪,৫১ দ্রষ্টব্য). যে মন কোরান হইয়া গিয়াছে তাহা লা-মোকায় স্থিত এবং তাহা ‘এক কেতাব’ এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন এবং রক্ষিত থাকে। সাধারণ মন অর্থাৎ দুনিয়াবাসী মন বা অপবিত্র মন উহা দেখিতে, বুঝিতে এবং চিনিতে অক্ষম।



'কেতাব' সম্পর্কে পুরুষোত্তম নজরুল বলেছেনঃ তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
                                                       সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!


উম্মুল কেতাব কি?বিজ্ঞানময় নূরে মোহাম্মদীকে উম্মুল কেতাব বা কেতাবের মা বলা হইয়াছে। সৃষ্টিরূপে স্রষ্টার বিকাশ হইতেছে তাহা মাতৃ-স্বরূপা নূরে মোহাম্মদী হইতে জন্মলাভ করিয়া থাকে। বস্তুজগতে নূরে মোহাম্মদী প্রতীক হইল সূর্য। কোরানের ভাষায় ইহা স্ত্রী-লিঙ্গ।

(কোরান দর্শনঃ সদর উদ্দিন আহ্‌মদ চিশতী)

Comments

Popular Posts