কোরানের আলোকে জন্মান্তরবাদ/পুনর্জন্মবাদ/রুপান্তরবাদ দর্শন


কোরানের অঙ্কতি জীবন দর্শন পুনর্জন্মবাদের উপরে সুপ্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে। যে কোন ধর্মাবলম্বী প্রকৃত ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করিলে (অর্থাৎ আপন রবের নিকট বা সম্যক গুরুর নিকট সঠিক আত্মসমর্পণের ধর্ম অনুসরণ করিলে) তাহাদের মানে মোমিন ও প্রকৃত মুসলমানের জন্য পুনর্জন্ম নাই। এইরূপে বলা যাইতে পারে যে, প্রকৃত ইসলামে পুনর্জন্ম নাই। তাঁহারা জন্মচক্রে হইতে মুক্ত। পুনর্জন্মের কথা কোরানের ভাষা চাতুর্যে প্রচ্ছন্ন করিয়া রাখা হইয়াছে। রসুলের শিষ্যবর্গের মধ্যে মোমিনের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। মোমিনগণ চক্ষুষ্মান হওয়া সত্ত্বেও রসুলাল্লাহর নির্দেশ ক্রমে উহা প্রকাশ করেন নাই। ইহা সহজ ভাষায় সাধারণভাবে প্রকাশ করিলে তৎকালীন পশু-প্রকৃতির মূর্খ মরুবাসী আরবগণ যাহারা ছিল সংখ্যায় অত্যাধিক, তাহারা ধর্ম গ্রহণ করিত না এবং করিলেও আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে একেবারেই শিথিল থাকিত। রাষ্ট্রীয় গোলযোগের কারণে খেলাফত কালে ইহার প্রকাশ হয় নাই। তারপর যদিও মিশরে ফাতেমী রাজত্ব কালে এই মতবাদ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেখানে প্রচলিত হইতে পারিয়াছিল, তথাপি ইহা বেশি দিন সেখানেও টিকিয়া থাকিতে পারে নাই। প্রায় আড়াই শত বৎসর ফাতেমী রাজত্ব করেন। সুলতান সালাউদ্দিন সেই দেশ জয় করেন এবং এই মতবাদ পুনরায় সেখান হইতে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়া হয়।জন্মান্তরবাদ শব্দটি কোরানে নাই। যাহা আছে তাহাকে রূপান্তর বাদ বলা যাইতে পারে। জৈব এবং অজৈব সবকিছুর রূপান্তর ঘটিতেই আছে। কোন কিছুই আপন অবস্থায় স্থির থাকিতেছে না। এই রূপান্তরকে আমরা স্থূলভাবে পুনর্জন্ম বলিয়া থাকি। এইরূপ রূপান্তরের কারণেই আমি, তুমি বা সে বলিতে কিছুই নাই। যাহা আছে বলিয়া আমরা দেখিতেছি তাহা অদ্বৈত আহাদ রূপেরই একক প্রকাশ বা লীলা-ভঙ্গি। ইহাকেই বিভিন্ন জাতি জন্মান্তর বাদ Transmigration of the Soul বলিয়াছে। কোরানে জন্মান্তর কিংবা রূপান্তর এইরূপ কোন একটি শব্দ ব্যবহার করিয়া বিষয়টির প্রকাশ কোথাও করেন নাই। অথচ রূপক বর্ণনার সাহায্যে বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত ও ব্যাপকভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। কোরানে যেভাবে রূপান্তর বিষয়টি নিখুঁতভাবে অঙ্কন করিয়াছেন তাহা বিজ্ঞান সম্মত এবং তাহাই জীবন দর্শনের সম্যক বা আসল রূপ।

কোরানে জন্মান্তরবাদ/পুনর্জন্মবাদ/রুপান্তরবাদ :
সূরা বাকারাঃ২৮। তোমরা কেমন করিয়া আল্লাহ্‌র সঙ্গে মিথ্যা আরোপ কর? এবং তোমরা ছিলে মৃত, সুতারাং তিনি তোমাদিগকে জীবিত করিলেন। তারপর তোমাদিগকে মৃত্যুদান করেন, তারপর তোমাদিগকে জীবনদান করেন, তারপর তাঁহার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন।
ব্যাখ্যাঃ- প্রাকৃতিক মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুবরণ না করিতে পারিলে মানুষ মুক্তিলাভ করিতে পারে না, যাহার ফলে মৃতের জগতেই সে বাস করে এবং জন্ম-মৃত্যুর আবর্তে সে বন্দী হইয়া থাকে। প্রথমেই বলা হইতেছে “এবং তোমরা ছিলে মৃত” ‘এবং’ শব্দটি মানব জীবনের অতীতের ইঙ্গিত হিসাবে উল্লেখ হইয়াছে। সেখানে হইতে তিনি তোমাদিগকে জীবন দান করিলেন। তারপর তোমাদিগকে মৃত্যু দান করেন। তারপর তোমাদিগকে জীবন দান করেন। তারপর তাঁহার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। “তাঁহার দিকে প্রত্যাবর্তন করা” অর্থ সংশোধনের জন্য নবজন্মে আনয়ন করা। ‘তারপর’ কথাটি তিনবার উল্লেখ করিয়া জন্ম-মৃত্যুর পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিতেছেন। কোরানে অন্যত্র আছেঃ “আল্লাহ্‌ জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টি করিয়াছেন মানুষকে পরিক্ষা করিবার জন্য (৬৭:২)
সূরা বাকারাঃ ৫০। এবং যখন আমরা তোমাদের সঙ্গের সমুদ্রটিকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিলাম, তারপর তোমাদিগকে মুক্ত করিলাম (বা উদ্ধার করিলাম) এবং ফেরাউনের দলকে ডুবাইয়া দিলাম এবং তোমরা (ইহা) দেখিতেছ (অর্থাৎ বনি ইসরাইলরা ইহা দেখিতেছ)

ব্যাখ্যাঃ সপ্ত ইন্দ্রিয় দ্বারপথে দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ ইত্যাদি রূপে যেই সকল ধর্ম আগমন করে সেইগুলিকে সালাতের সঙ্গে সঠিকভাবে গ্রহণ-বর্জন না করিলে সেইগুলি হয় শেরেক(*1) বা সংস্কার। এই শেরেক বা সংস্কারকে রূপকভাবে সমুদ্র বলা হইয়াছে। সংস্কারের যে সমুদ্র মানুষের সঙ্গে সংলগ্ন হইয়া আছে সালাতী ব্যক্তি ব্যতীত সবাই ইহাতে ডুবিয়া যায়। অর্থাৎ পুনর্জন্ম লাভ করে। বনি ইসরাইলগণ সত্যদ্রষ্টা মহাপুরুষ। তাঁহারা এই সমুদ্র হইতে গুরুর কৃপায় বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছেন। অপরপক্ষে ফেরাউনের দলবল সালাত না করিবার কারণে সংস্কার সাগরে ডুবিয়া মরে এবং পুনর্জন্মে আসে। বনি ইসরাইলগণ এই সত্য অহরহ দেখিতে পান। তাঁহারা মনের রাজা। তাঁহাদের দৃষ্টিতে মানব মনের এই শেরেক অবস্থা সর্বদা দৃশ্যমান।সংস্কার সাগরে ডুবিয়া মরাকে সায়াত(*2) বা ধবংসাত্মক মৃত্যু বলা হয়। মহাপুরুষগণ ‘সায়াত’-এর জ্ঞানে জ্ঞানী (৪৩:৬১)
শব্দ সংজ্ঞাঃ (*1) শেরেক অর্থ সংযুক্তি, কিছুর সঙ্গে শরীক হওয়া, মনের অংশীবাদ। গায়ারাল্লাহর সঙ্গে অর্থাৎ গুরু ব্যতীত অন্য কিছুর সঙ্গে মন সংযুক্ত বা সম্পৃক্ত হইলে কোরানে সেই মনকে ‘মোশরেক’ বলে। জিন এবং মনুষ্য জাতির মধ্যে শেরেকের এই অপরাধ ব্যাপক ও সুক্ষ্মভাবে বিরাজ করে। সকল প্রকার পাপের মূল হইল এই শের্ক। এইজন্য ইহা গুরুতর অপরাধ।
(*2) সায়াতের ভাষাগত অর্থ হইল এক ঘণ্টা হইতে অল্প অধিক একটি কাল- যেমন আমরা বলিয়া থাকি প্রহর। কোরানের পরিভাষাগত অর্থ হইলঃ জাহান্নামগামী অকৃতকার্য ব্যক্তির ধ্বংসাত্মক মৃত্যুকাল। কেবল মহাপুরুষগণ সায়াত হইতে মুক্ত হইয়া যান। অতএব সায়াত অর্থ একদিনের একটি অংশ অথবা ধ্বংসাত্মক মৃত্যুকাল।

সূরা নেসাঃ৫৬। নিশ্চয় আমাদের পরিচয়ের সঙ্গে যাহারা মিথ্যা আরোপ করে শীঘ্রই আমরা তাহাদিগকে সংশোধনের আগুনে জ্বালাইয়া থাকি। যতবার তাহাদের ত্বক রোদে পুড়িয়া পরিপক্ক হইবে ততবার উহা বদলাইয়া তাহাদিগকে নূতন ত্বক দিব যেন তাহারা ভোগ করে শাস্তি। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ শক্তিশালী বিজ্ঞানময় বিচারক।
ব্যাখ্যাঃ মানুষের ইন্দ্রিয়পথে আগমনকারী ধর্মরাশি ‘আল্লাহ্‌র আয়াত’. এইগুলি উপর সালাত প্রয়োগ আল্লাহ্‌র পরিচয় লাভ করা যায় এবং সালাত না করিলে এখান হইতে আল্লাহ্‌র পরিচয় লাভ করা যায় না। এইগুলিকে মিথ্যায়িত করা হয়।যিনি বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ্‌, তাঁহার উপর মিথ্যা আরোপ করিবার শক্তি কাহারও নাই। আপন সত্ত্বার মধ্যে যে আল্লাহিয়াত আছে তাহার উপর মিথ্যা আরোপ হয়। সালাত কর্ম দ্বারাই কেবল এই মিথ্যা দূর করা সম্ভব। সালাত না করিলে আগমনকারী বিষয়সমূহের প্রতি আসক্তি এবং মোহ জন্মায় এবং তাহা দ্বারা নিজের মধ্যেই আল্লাহ্‌র বিকাশ প্রচ্ছন্ন হইয়া যায়। ইহাকেই বলা হইয়াছে “আল্লাহ্‌র উপর মিথ্যা আরোপ করা”.ইহা দ্বারা জন্মচক্রে জাহান্নামের আগুনে আবদ্ধ হইয়া থাকে। যতবার তাহাদের নূতন কচি ত্বক রোদে পুড়িয়া পরিপক্ক হইবে, মুক্তি অর্জন না করিলে ততবার তাহা বদলাইয়া তাহাদিগকে নূতন ত্বক দেওয়া হইবে, শান্তি ভোগের জন্য।
(মন্তব্যঃ আলোচ্য বাক্যটিতে ‘কাফারু’ বলতে মিথ্যা দ্বারা আবৃত বা মিথ্যা আরোপ করা বুঝায়। কাফের শব্দটি ‘কাফেরুন’ ধাতু থেকে আসিয়াছে; এর আভিধানিক অর্থ আবৃত করা বা ঢেকে ফেলা। কোরানেরর পরিভাষায় সত্যকে যাহারা সত্য জানিয়াও ঢাকিয়া রাখে তাহারা কাফের। ইহা ছাড়া সত্য যাহার মধ্যে ঢাকা পড়িয়া আছে সে-ই কাফের। কোরানে উল্লেখ আছেঃ ওয়াল্লাহু মুহিতুম বিল কাফেরিন- এবং আল্লাহ্‌ কাফেরদের দ্বারা আবৃত হয়ে আছেন।(২:১৯) প্রত্যেকের ভিতরে আল্লাহিয়াত সুপ্ত হয়ে আছে, কিন্তু আল্লাহিয়াতকে নাফসানিয়াতের স্বেচ্ছাচারীতা দ্বারা আবৃত করে রাখা হয়েছে বলিয়া কাফেরদের মধ্যে আল্লাহিয়াতের প্রকাশ বাধাপ্রাপ্ত, তাই তারা কাফের।বাক্যটিতে ‘নুসলি’ শব্দটি লক্ষ্য করার মতো। ‘নুসলি’ অর্থ আগুনে সেক দেয়া অর্থাৎ জাহান্নামের আগুনে সেক দেয়া। প্রচলিত ধারনামতে, জাহান্নামের আগুনে সেক দেওয়ার মতো কোন বিষয় নাই, সেখানে বরং লাকড়ি পোড়ানের মতো করে পড়ানোর ব্যবস্থা থাকবে। প্রকৃত অর্থে, সংশোধন বুঝাতে ভাষা চাতুর্যে আগুনে সেক দেয়া বলা হয়েছে। সেক দেয়া মানেই হল- পূর্বাবস্থায় বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। জাহান্নামের আগুনে সেক দেয়া মানে হল সংশোধনের নিমিত্তে সেক দেয়া; সংশোধিত না হয়ে কেহ জান্নাতে প্রবেশাধিকার পায় না। কোরানে উল্লেখ আছেঃ এবং তোমাদের কেহ নাই যে ইহাতে না অাসিবে, (ইহা) তোমার রবের উপর (ন্যাস্ত) জরুরী একটি গৃহিত সিদ্ধান্ত।(১৯:৭১) জাহান্নাম অতিক্রম করিয়াই জান্নাতে যাইতে হয়। জাহান্নাম অতিক্রম করাইয়া জান্নাতে উত্তরণ করিবার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার বিষয়টি প্রত্যেকের মধ্যে অবস্থিত আপন রবের নিকট রহিয়াছে।)
(সূরা নেসাঃ১১৯) এবং তাহাদিগকে অবশ্য পথভ্রষ্ট করিব এবং তাহাদিগকে (মিথ্যা) আশা দিব এবং তাহাদিগকে আদেশ-নির্দেশ করিব- অতএব তাহারা অবশ্য পশুর কান কাটিবে এবং তাহাদিগকে আদেশ নির্দেশ দিব- অতএব তাহারা অবশ্য পরিবর্তন করিবে আল্লাহ্‌র রূপান্তর সৃষ্টি। এবং যে দুর্বল আল্লাহ্‌র অংশ হইতে শয়তানকে একজন বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তবে সে স্পষ্ট একটা ক্ষতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
#ব্যাখ্যাঃ বস্তুবাদী শয়তান(*1) তার অনুসারীদিগকে বিষয় মোহের দিকে এমন উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়া থাকে যে, তখন তাহারা অবশ্য পশুর কান কাটিবে এবং তাহাদিগকে এমন সব আদেশ নির্দেশ দিবে যাহাতে তাহারা আল্লাহ্‌র(*2) রূপান্তরিত সৃষ্টিকে অবশ্য পরিবর্তন করিবে। “পশুর কান কাটা এবং আল্লাহ্‌র রূপান্তরিত সৃষ্টিকে পরিবর্তন করা” কথা দুইটি একই ভাব বহন করে।“কান কাটা” কথাটি অপমানজনক একটি কথা। পশুর কান কাটিয়া তৎকালীন আরবগণ যেমন সেই পশুকে আল্লাহ্‌র পরিবর্তে দেব-দেবীর দিকে উৎসর্গের জন্য চিহ্নিত করিত শয়তানও তেমনই মানুষপশুর কান কাটিয়া তাহাকে নিম্নগতি করে। ইহা একটি সুন্দর রূপক কথা। এইরূপে আল্লাহ্‌র রূপান্তরিত সৃষ্টি ইনসানকে(*3) তাহারা পরিবর্তন করিয়া পশুর পর্যায়ে নামাইয়া আনে। কোরান মানুষকে সর্বোচ্চ মানের পশু বলিয়াছেন (সূরা আনাম দ্রষ্টব্য)।আল্লাহ্‌ ও তাঁহার প্রতিনিধিগণ সাধারণ জীবদিগকে উত্তোরিত করিয়া ইনসানিয়াতে পৌঁছাইয়া থাকেন। ইনসানগনই কেবল নিজ আমল দ্বারা মুক্তিপথে অগ্রসর হইবার যোগ্য। মিথ্যা আশায় আশান্বিত হইয়া ইনসানগণ আল্লাহ্‌ ও রসুলের নীতিবাদ গ্রহণ করিলে অধঃপতিত হয়। আল্লাহ্‌ ও তাঁহার প্রতিনিধিগণ জীবগণকে ‘খালাকা’ করেন ইনসানিয়াতের দিকে আর শয়তান ও তাহার দলীয়গণ ইনসানকে ‘খালাকা’(*4) করে পশুত্বের দিকে।
টীকাভাষ্যঃ- (*1)শয়তান(২৩:৯৭)কলুষিত, অশুদ্ধ মন বা আম্মারা নফসকে (চিত্তবৃত্তির সামগ্রিক অভিব্যক্তিকে নফস বলে) অর্থাৎ ভ্রান্ত মানুষকে সাধারণত ভাবে শয়তান বলা হইয়াছে। জ্বিন যেহেতু মানুষের মধ্যে নিম্নমানের জীব সেইহেতু জ্বিনদের মধ্যে ভ্রান্তির পরিমাণ অধিক। মানুষের মধ্যে যে কোন পর্যায়েই কেহ থাকুক না কেন যদি সে গুরুর নীতিমালার অবাধ্য হয় তবেই সে শয়তান নামে আখ্যায়িত হয়। অবাধ্যতার পর্যায় অনুসারে শয়তানের শয়তানী কম-বেশী হইয়া থাকে। সম্যক গুরুই আর-রহমান রূপে নিম্নমানের মনুষ্য জীবকে শিক্ষা ও দীক্ষা দান করিয়া তাহাদিগকে ইনসান বানাইয়া থাকেন (৫৫:১).সুতারাং যে নফস বা ব্যক্তি সম্যক জ্ঞান অর্জন করে নাই অথবা সম্যক গুরুর নির্দেশিত পথে চলে নাই সেই মন বা ব্যক্তি শয়তান। শয়তান বাহিরের অন্য কোন জীব নহে। শয়তান মনুষ্য এবং জিন জাতি হইতে উদ্ভূত হইয়া থাকে। আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রসুলের নির্দেশিত পথের না হইলেই তাহাকে শয়তান বলা চলে।পূর্ণতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পরিশুদ্ধ মন বা মোৎমায়েন্না নফস ছাড়া প্রত্যেকটি মানুষের আপন নফসই কম-বেশি শয়তান।সকল প্রকার দুঃখ ভোগের একমাত্র কারণ হইল শয়তান। মানুষের আমিত্বই শয়তান। ‘আমি ও আমার’ ইহাই শয়তানের কথা। আমিত্বের আশ্রয়ে থাকা জাহান্নাম। আল্লাহ্‌র আশ্রয়ে থাকা জান্নাত। যে যত বেশি আমিত্ব প্রকাশ করে সে তত বেশি জাহান্নামের গভীরে বাস করে।প্রত্যেকটি বিষয়ের দুইটি রূপ আছেঃ একটি বহির্মুখী রূপ, বস্তুবাদ অপরটি অন্তর্মুখী রূপ, আধ্যাত্মবাদ। এই ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, শয়তানের বহির্মুখী রূপটি হইল ব্যক্তি নিজেই আর অন্তর্মুখী রূপটি হইল তাহার কলুষিত, অশুদ্ধ মন। অবশ্য প্রচলিত মতে, শয়তান স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পন্ন।
(*2)আল্লাহঃ- (আর্দ ও সামা) সৃষ্টির ও মনের কেন্দ্রবিন্দুটি হইলেন আল্লাহ্‌। আল+ইলাহ। অর্থাৎ একমাত্র উপাস্য।ইলাহ্‌ অর্থ কর্তা, নেতা, অধিকারী, তাই উপাস্য। সৃষ্টিময় আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ্‌ নাই। মোহাম্মদ (আ.) ব্যতীত নিরাকার আল্লাহ্‌র পরিচয়ের কোন প্রকাশ নাই। সৃষ্টি পরিচালনার জন্য তাঁহারই উপর সকল নেতৃত্ব কর্তৃত্ব এবং অধিকার ন্যস্ত রহিয়াছে। সুতারাং তিনিই হইলেন আল ইলাহ্‌'র প্রকাশ্য অভিব্যক্তি। সকল মহাপুরুষ ঐ জাহেরী ইলাহ্‌'রই পরিচয় প্রকাশক।একমাত্র সেই ইলাহ্‌'র নির্দেশ ব্যতীত মনুষ্য জীবনের নির্ভরের অন্যান্য বস্তু ও ব্যক্তিগনকে মানুষ যেইরূপ কর্তৃত্বের আসনে বসাইয়া থাকে কাল্পনিক বা মিথ্যা ইলাহ্‌; যেহেতু এই ইলাহ্‌সমূহ নিজেরাই অস্থায়ী এবং আল ইলাহ্‌'র নিয়ন্ত্রণাধীন।
(*3)ইনসানঃ- যে মানুষ তার ত্রুটি সম্বন্ধে জাগ্রত এবং একটা বাস্তব এবং সত্য মনোভাবের উপর দাঁড়ায়। ইনসান অলিক মনোভাবকে কোন গুরুত্বই দেয় না। ইনসানের মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে যাহা অন্যের নাই। ইনসান গুরুর গুরুত্ব বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন এবং কমবেশী গুরুর সাহচর্যে থাকে। রহমান প্রভুগুরু রূপে জিনকে কোরান শিক্ষা দিয়া ইনসানে রূপান্তর করেন। তারপর তাহাকে সর্ববিষয়ের ব্যাখ্যা দান করেন (৫৫:১-৪). গুরু এবং ইনসানের সম্পর্কে আন্তরিকভাবে ঘনিষ্ঠ এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গুরুর বাহিরে সে কোন অস্তিত্ব মানে না, যদিও অতীত কর্মের কারণে গুরুকে পূর্ণভাবে অনুসরণ করিতে সক্ষম হয় না। এই সংজ্ঞার বহির্ভূত মনসূমহ সবাই জিন। গুরুর বাহিরে কোন ইনসান নাই। ইনসানের বহুবচন নাস।ইনসান জান্নাতের প্রথম পর্যায়ে উন্নীত হইলে তাহাকে আদমও বলা যাইতে পারে। সুতারাং আদম পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব সর্বযুগেই বিদ্যমান।
ইনসান জীবশ্রেষ্ঠ। তাই সে জ্ঞানে গরিমায়, কৃষ্টি সভ্যতা ইত্যাদি সর্বদিক হইতে অন্য সকল জীবকুল হইতে নিজেকে ধনবানরূপে দেখিতে পায়। এইগুলি অবশ্য স্বর্গীয় গুণ এবং গৌরবের বিষয়। গুরুগণ হইতে এইগুলি অর্জন করিয়াই সে নিজেকে আপন গৌরবে গৌরবান্বিত দেখিতেছে। আসলে তাহার মস্তিষ্ক যে সকল উন্নতমানের উপার্জন দ্বারা ভরপুর হইয়া আছে, তাহা যে পুনর্জন্মের উপাদান হইয়াই মস্তিষ্কে জমা হইয়া আছে এইকথা বুঝিতে সে বোকামি করিতেছে। নিন্মমানের মানুষ এবং ইতর জীবকুল ইহা না বুঝিতে পারে কিন্তু ইনসান ইহা বুঝিবার যোগ্যতা রাখে। এইজন্য লা-মোকার কথা না বুঝিতে চাহিলে ইনসানকে বোকা বা বলদ বলিয়া আখ্যায়িত করা হইতেছে।মানুষ স্বভাবতই সালাত বিরোধী। সালাত মস্তিষ্কের মধ্যে মহাশূন্যতা আনয়ন করে। বিপরীত দিকে শেরেক আনয়ন করে প্রাচুর্য এবং মনের বহুমুখী ধন সম্ভার, যাহা আপাতদৃষ্টিতে অধিক সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। এই জন্য ইনসান জান্নাতমুখী হইতে ভালবাসে এবং গুণগ্রাম সহকারে নিজেকে জান্নাতের ধনে ধনীরূপে দেখে। মুক্তিলাভের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে না। বিশ্বের সুসভ্য গুরুবাদী ইনসানগণ কল্যাণমুখী কিন্তু মুক্তিমুখী নয়, তথা জান্নাতমুখী কিন্তু লা-মুখী নয়। ইহা সালাতের বিরোধীতা বা সালাতের প্রতি অনীহা।
(*4) রূপান্তরিত সৃষ্টিকে খালাকা বলে। খালাকা দ্বারা মৌলিক সৃষ্টি বুঝায় না। জীবজগতে ইনসান একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। মানুষের মধ্যে যাহারা সম্যক গুরুর শিক্ষা লাভ করিয়া সাধারণ জীব পর্যায় বা জিন পর্যায় অতিক্রম করিয়া গুরুভক্ত হইতে পারিয়াছে তাহারাই ইনসান। ইনসান সম্যক অবস্থা লাভ করে নাই কিন্তু মুক্তি পথের যাত্রী হইবার উপযুক্ত মন-মানসিকতা অর্জন করিয়াছে। ‘খালাকা’ অর্থ প্রথম বা মৌলিক সৃষ্টি নয়। ‘খালাকা’ কথা দ্বারা রূপান্তরিত সৃষ্টি বুঝায় যাহাতে গুনগত এবং প্রকৃতিগত পরিবর্তন ঘটে। আদি সৃষ্টি বুঝাইবার জন্য ব্যবহৃত শব্দ হইল ‘বদি’।
*এবং তাহারা (মানুষেরা) মনে করে যেমন তোমরা মনে করিয়া থাক যে, আহাদ আল্লাহ্‌ কাহাকেও পুনর্জীবিত (বা উত্থিত) করেন না (বা করিবেন না), (৭২:৭)
ব্যাখ্যাঃ ধর্মের একটি প্রধান ভিত্তি পুনর্জন্মবাদ। পাপ-পূণ্যের সুক্ষ্ম সুবিচারের ভিত্তির উপর পুনর্জন্মের বিধান রচনা করা হইয়াছে। পুনর্জন্মের জ্ঞানকে ‘এলমে সায়াত’ বলে। মহাপুরুষের সান্নিধ্য লাভ না করিতে পারিলে দুই-এক জীবনের প্রচেষ্টায় সহজে জান্নাতবাসী হওয়া যায় না। জান্নাতবাসী হইতে চাহিলে মনকে বস্তু জগতের লোভ-মোহ হইতে মুক্ত এবং পরিশুদ্ধ করিয়া মন হইতে আমিত্বের উচ্ছেদ সাধন করিতেই হইবে। দেহ-ভিত্তিক মন নিজের একক ক্ষমতায় সংসার জীবনে সেই পর্যায়ে যাইতে পারে না। এই জন্য সংসার-ভোগী মানুষ পুনর্জন্মবাদের বিশ্বাস রাখিতে চায় না। ‘বায়েস’ অর্থ উত্থিত হওয়া, জন্মান। বৃক্ষাদির মত মানুষও বীজ হইতে উত্থিত হইতেছে এবং পরিণামে আবার বীজে পরিণত হইতেছে। ইহা আহাদরূপী আল্লাহ্‌র কার্যক্রম। সৃষ্টির মধ্যে আহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অর্থই আমিত্বের দিকে পুনরায় দুনিয়ার জীবনে চলিয়া আসা। আহাদের সৃজিত এই বন্ধনী হইতে মুক্তি লাভ করাই জীবনের চরম সার্থকতা।
মন্তব্যঃ সৃষ্ট জগতে আল্লাহ-তা’লা আহাদ রূপে বিরাজিত। অর্থাৎ সবকিছুর মধ্যে তিনিই এককভাবে বিরাজিত আছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকে তাঁহারই সৃজিত নির্দিষ্ট তকদীরের মধ্যে সৃজন করিয়া উহাতে তাঁহার আপন সেফাতের যে স্বল্প বিকাশ-ব্যবস্থা দান করিয়া থাকেন, মেয়াদ শেষ হইয়া গেলে তাহা (অর্থাৎ সেই আরোপিত সেফাত) সামাদে নিমজ্জিত বা অদৃশ্য হইয়া যায়। অতএব এই সকল অস্থায়ী সৃষ্টির নিকট সাময়িক আশ্রয় লাভের আকাঙ্ক্ষা করিলে বা আহ্বান জানাইলে বা নির্ভরের বিশ্বাস করিলে আহাদের সঙ্গে শের্ক করা হয়।
টীকাভাষ্যঃ
*আহাদ আল্লাহঃ আল্লাহ্‌র প্রকাশিত রূপের মধ্যে ইহা নিম্নমানের দুর্বল স্তর। ‘আহাদ’ শব্দটি মূলতই বহুবচন। যেমন ইংরেজি শব্দ ‘আর্মি’ তেমনই আহাদ শব্দটিও। একজনকে লইয়া ‘আর্মি’ হয় না। ‘আহাদ’ শব্দটি অর্থ এক বলিলে ভুল হইবে। ইহার অর্থ একক বলা-ই উত্তম। এককের সংজ্ঞা এমনভাবে দেওয়া যাইতে পরে যে, যে-বহুর সমষ্টি এক মূলের সহিত যুক্ত তাহাই একক। এই দৃশ্যমান জগতে জীব, জড় ও শক্তিরূপে আল্লাহ্‌ নিজেই বহুরূপে রূপায়িত। তাঁহার বাহিরে কোন অস্তিত্ব নাই। সমগ্র সৃষ্টি তাঁহার সেফাত হইতে আগত এবং তাঁহা হইতে প্রাপ্ত সেফাত সাময়িক। সৃষ্টি তাহার আলাদা অস্তিত্ব লইয়া দাঁড়াইয়া আছে বলিয়া মনে হইলেও স্রষ্টার সেফাতের বাহিরে তাহার আপন বা নিজস্ব কোন সেফাত নাই।

আহাদ জগত নারী প্রকৃতি। যাহা উৎপাদনশীল তাহাই প্রকৃতি। তবে যে-সত্ত্বা মহিমান্বিত আল্লাহ্‌র শক্তিতে শক্তিমান হইয়া সৃজনী শক্তির অধিকারী হইয়াছেন, তিনি উৎপাদনশীলতার সহিত জড়িত থাকা সত্ত্বেও আহাদ জগতের অন্তর্ভুক্ত নন। তিনি যদি আহাদ জগতের বাসিন্দা তবুও সামাদ জগতের ব্যক্তিত্ব।
আহাদ জগতের প্রতিটি সত্ত্বা দুর্বল, অস্থায়ী, অধম, মন্দ। জড় জগত, জীব জগত, মনুষ্য জগত এবং মনুষ্য জগতের মধ্যকার জাহান্নাম ও জান্নাত সকলই আহাদ জগতের অন্তর্ভুক্ত। আহাদ জগতের প্রতিটি সত্ত্বা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। পরস্পরের নির্ভরশীলতায় আহাদের সবাই একধর্মী। একজনকে ব্যতিরেকে অপরজন অচল। তাই আহাদ জগত দুঃখময়। বস্তুজগতের যাহা কিছু আমরা দেখি, শুনি ও অনুভব করি তাহা আহাদ আল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। জন্ম, মৃত্যু, জরা, রোগ, শোক, আনন্দ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি এই আহাদ জগতের উপাদান ও গুণাবলী। কোরানে আল্লাহ্‌র এই স্তরকে তাই বলা হইয়াছে ‘দুনাল্লাহ’ অর্থাৎ দুর্বল বা মন্দ আল্লাহ্‌। সুতারাং মানুষের মুক্তি পথে দুর্বল আল্লাহ্‌ হইতে কোন অভিভাবক বন্ধু এবং সাহায্যকারী নাই। জীব সত্ত্বা ক্রমোন্নতি প্রাপ্ত হইয়া বুদ্ধিমত্তায় উন্নত পর্যায়ে অর্থাৎ মানব-রূপে আসে। মানব হইতে ক্রমশ আত্মোন্নতির সাহায্যে সামাদিয়াত অর্জন করিতে পারে। আহাদ জগতের দুর্বল সত্ত্বা কর্তৃক দুর্বল সত্ত্বার বা দুর্বল আল্লাহ্‌র উপর আজীবন নির্ভরতা বা দাসত্বের পরিনাম— জাহান্নাম। অপর পক্ষে দুর্বল সত্ত্বা কর্তৃক কোন শক্তিশালী সত্ত্বা অর্থাৎ সামাদ আল্লাহ্‌র উপর নির্ভরতা ও দাসত্বের ফল— প্রাথমিক পর্যায় জান্নাত এবং তদ্‌পরবর্তীতে মুক্তি। এই মুক্তি জাহান্নাম হইতে মুক্তি, এই মুক্তি সৃষ্টির বন্ধন হইতে মুক্তি।
*অনুবাদ (১১৩ঃ২) “রূপান্তর সৃষ্টির অপকারিতা হইতে,
ব্যাখ্যাঃ‘খালাকা’ অর্থ রূপান্তর সৃষ্টি। সৃষ্টিকে এক অবস্থা হইতে অন্য অবস্থায়, একরূপ হইতে অর্থাৎ উপস্থিত রূপ হইতে ভিন্ন রূপে রূপান্তর করা বা ভিন্ন রূপ দান করা। যেমন গাছকে ফার্নিচারে রূপান্তর করা হয়। কোন বিষয়ে অজ্ঞান ব্যক্তিকে সেই বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরূপে গড়িয়া তোলা ইত্যাদি। বিশ্ব মানব সমাজে রূপান্তর সৃষ্টির ব্যাপক ও বিরাট সমাহার বিদ্যমান। স্কুল, মাদ্রাসা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা কেন্দ্রসমূহ মানুষকে গুণগতভাবে রূপান্তর করিতেছে। শিশু তার আপন চিন্তা-চেতনা হইতে রূপান্তরিত হইয়া বালক স্বভাব অর্জন করিতেছে। বালকদিগকে রূপান্তরিত করিয়া বহুরূপে গড়িয়া তোলা হইতেছে।

মানুষের মধ্যে রূপান্তর হইতেছে আছে। এই রূপান্তর ভাল দিকে, না মন্দ দিকে হইতেছে তাহাই বিচার্য বিষয়। রূপান্তর সৃষ্টি যদি আল্লাহ্‌র নুরের দিকে অর্থাৎ আল্লাহ্‌র গুণ অর্জনের দিকে করা না হয় তবে উহা মন্দ রূপান্তর। ইহার প্রভাব হইতে সরিয়া বা বাঁচিয়া থাকিতে চাহিলে সম্যক গুরুর আশ্রয় একান্ত প্রয়োজন। সম্যক গুরু কল্যাণমুখী রূপান্তর করিয়া শিষ্যকে শিরিক হইতে উদ্ধার করিবেন।
মানুষের আত্মিক মঙ্গল এবং অমঙ্গল নির্ভর করে রূপান্তর সৃষ্টির শিক্ষা নীতির উপর। নবি, রসুল এবং উলিল আমর ব্যক্তিবর্গের দ্বারা মানুষকে রূপান্তর করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করিলে সকল মানুষ কল্যাণপ্রাপ্ত হইবে। তাহা না হইলে মোহ বন্ধনের ব্যাপক বিভ্রান্তির মধ্যে মনুষ্য সমাজ নিপতিত হইয়া মোশরেকে পরিণত হইয়া থাকে।
*আল্লাহ্‌ সকল জীব (খালাকা) সৃষ্টি করিয়াছেন পানি হইতে। সেইজন্য উহাদিগের মধ্যে হইতে কতক পেটের উপর (ভর দিয়া) চলে এবং উহাদের কতক চারি পায়ের উপর চলে; আল্লাহ্‌ খালাকা করেন উহারা অবিরামভাবে যেমন হইতে চায়। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ প্রতিটি বিষয়ের উপর তকদীর দাতা শক্তি। (২৪:৪৫)
ব্যাখ্যাঃ ‘খালাকা’ অর্থ রূপান্তর সৃষ্টি করা আল্লাহ্‌ তকদীর দাতা রূপান্তর সৃষ্টিকর্তা। জীবগণ বিশেষ করিয়া মানুষ যে যাহা অবিরামভাবে চায় সে তাহাই পায়। যেরূপ হইতে চায় সেইরূপ তাহাকে বানাইয়া দেওয়া হয়। এইরূপে জীবগণ তাহাদের চাহিদা অনুযায়ী আপন তকদীর আপনি রচনা করে এবং সেই অনুসারে রূপান্তরিত অবস্থা দান করেন আল্লাহ। এই বাক্যে জীব-জগতের বিবর্তনবাদের ইংঙ্গিত করা হইয়াছে। যে সকল জীব পেটের উপর ভর দিয়া চলে কিংবা দুই পায়ে বা চারি পায়ে চলে তাহাদের সকলকেই আল্লাহ একইরূপ পানি হইতে সৃষ্টি করেন। এই কথা দ্বারা শুক্রের দিকে ইঙ্গিত করিয়াছেন।
*আমরা তাহাদিগকে রূপান্তর সৃষ্টি করিয়াছি এবং আমরা আজীবন কঠিন করিয়াছি তাহাদের বন্ধন। এবং যখন আমরা ইচ্ছা করি একই পরিবর্তনে পরিবর্তন করিয়া দেই তাহাদের মেশাল (অর্থাৎ স্বরূপ)।(৭৬:২৮)
ব্যাখ্যাঃ রূপান্তর সৃষ্টির মাধ্যমে রব মানুষকে প্রখর বুদ্ধিবিবেচনার অধিকারী করিয়া দেন। ফলত :মানুষ আপন বৃত্তির গুণাগুলি দ্বারা সৃষ্টির মোহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়া থাকে। যখন তাহাকে মৃত্যু দেওয়া হয় তখন মানুষ যেই মনমানসিকতা ও মোহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকে ঠিক সেই স্তরের মানসিকতা ও মোহ বন্ধন সহকারে তাহাকে পরবর্তী স্বরূপে পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হয়। আল্লাহ কোন কিছু পরিবর্তন করেন না বান্দার ইচ্ছা ব্যতিরেকে অর্থাৎ বান্দা যাহা অর্জন করে এবং অর্জন করিতে সচেষ্ট থাকে সেই তাহাতেই তাহার স্বরূপ একইরূপ পরিবর্তনে পরিবর্তন করিয়া দেওয়া হয়।
*এবং যাহাকে দেওয়া হয় তাহার একটি দেহ তাহার পৃষ্ঠের অসীম পশ্চাতের,
তবে শীঘ্রই সে একটা ধবংস ডাকিয়া আনে, এবং সংশোধনী আগুনে প্রবেশ করে। নিশ্চয় সে তাহার স্বজনদিগের মধ্যে আনন্দিত ছিল আজীবন। (৮৪:১০-১৩)

#ব্যাখ্যা (১০-১৩) :বিবর্তনের ধারায় আমরা পশু-পক্ষী, জীব-জন্তু ইত্যাদি বহু পর্যায় অতিক্রম করিয়া মানব জন্ম লাভ করিয়াছি। মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর একান্ত অবাধ্য হয় তাহাকে পৃষ্ঠের অসীম পশ্চাতের পূর্ববর্তী একটি দেওয়া হয়। অর্থাৎ জাহান্নাম হইতেও নিম্নমানের জীবজগতের একটি দেহ দেওয়া হয়। পৃষ্ঠ বলিতে ঔরশ বুঝায় (Lion)। তাহাকে অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তাহার অতীতের একটা ঔরশে অবস্থান দেওয়া হয়। এইরূপ শাস্তি লাভ করা অর্থ নিজের ধ্বংস নিজে ডাকিয়া আনা এবং একটা সংশোধনী আগুনে অর্থাৎ দুঃখের জীবনে প্রবেশ করা।
এইরূপ দুঃখের জীবনে প্রবেশ করিবার প্রধান কারণ সে তাহার স্বজনগণের মধ্যে বস্তুমোহের আনন্দে আজীবন বিভোর ছিল। ধর্মরাশির ওপর সালাত পালনের কোন গুরুত্বই সে দেয় নাই। *নিশ্চয় সে ধারণা করে, সে ফিরিবে না।
নিশ্চয় ফিরিয়া আসিবে। নিশ্চয় তাহার রব তাহার সঙ্গে একজন দ্রষ্টা হইয়াই আছেন। (৮৪:১৪+১৫)

#ব্যাখ্যা (১৪+১৫): অসংযত জীবন যাপনের প্রধান একটি কারণ হইল জন্মান্তরবাদ বিশ্বাস না করা। বর্তমান মানব জীবনই প্রথম এবং শেষ জীবন মনে করা। অবিশ্বাসীর এইরূপ মিথ্যা ধারণা কে লক্ষ করিয়া কোরান বলিতেছেন :নিশ্চয় সে ফিরিয়া আসিবে এবং নিশ্চয় তাহার রব তাহার সঙ্গে তাহার সকল কর্মকাণ্ডের দ্রষ্টা হইয়াই আছেন। কখনও মানব সত্তা হইতে অনুপস্থিত থাকেন না।
*সুতরাং আমি শপথ করি সূর্যাস্তরাগের, এবং রাত্রির এবং (রাত্রি) যাহা কিছু সমাবেশ করে তাহার, এবং শফথ চন্দ্রের যখন উহা পূর্ণ হয়, নিশ্চয় তোমরা এক স্তর ত্যাগ করিয়া অন্য স্তরে ভ্রমণ করিয়া থাক। (৮৪:১৬-১৯)
#ব্যাখ্যা (১৬-১৯) : মানুষ জন্মমত্যুর আবর্তে তাহার আমল অনুযায়ী এক স্তর হইতে অন্য স্তরে উথ্থান পতনের মধ্যে ভ্রমণ করিতেই আছে। এই কথা শপথ করিয়া বলা হইতেছে তিনটি রূপক বনর্ণার সাহায্যে। সূর্যের অস্তরাগ কর্ম জীবনের আপাত সমাপ্তির ইঙ্গিত বহন করে। রাত্রিকে বিশ্রামের প্রতীকরূপে উল্লেখ করা হইয়াছে তাহাদের জন্য নিজ নিজ গৃহে আসিয়া রাত্রে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই দুইটি শফথ বাক্যের মধ্যে জন্ম মৃত্যুর আবর্তের ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে। তারপর চন্দ্রের শপথ যাহা উদিত হইয়া বা দৃশ্যমান হইয়া ক্রমশ বর্ধিত হইতে থাকে পূর্ণতার দিকে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে স্বর্গীয় নূর পূর্ণ চন্দ্ররূপে বিরাজ করে। কিন্তু মানুষের শেরেকের দ্বারা তথা মোহের আবরণে উহা তাহার মধ্যে প্রচ্ছন্ন হইয়া থাকে। সতকর্ম বা সালাতের অনুশীলন দ্বারা উহার বিকাশকে নিজের মধ্যে ধাপে ধাপে জন্মজন্মান্তরে ক্রমশ বর্ধিত করিয়া তুলিতে হয়। ইতর জীবজগৎ হইতে মনুষ্য জীবনে আসিবার পর দুই এক জীবনে পূর্ণ চন্দ্রের উদয় ঘটাইয়া তোলা সম্ভবপর হয় না। ইহার জন্য একান্তভাবে অবিরাম ইচ্ছা পোষণ করিতে হইবে সত কর্মের সাহায্যে। আমলের ভালমন্দ অনুসারে মানুষের উথ্থান পতন হয়। সুতরাং নরক ও স্বর্গের অনেকগুলি স্তর অতিক্রম করিয়া মুক্তির স্তরে পৌঁছিতে হয়। মুক্তির স্তরে পৌঁছিবার চেষ্টা না করিলে জীবজগতে মানুষের অনন্ত ভ্রমণের শেষ নাই।
প্রধান স্তর তিনটি :
পশু জীবন, জাহান্নামের জীবন এবং জান্নাতের জীবন। পশু জীবনে বহু স্তর আছে। জাহান্নাম এবং জান্নাতের জীবনেও সাতটি করিয়া স্তর আছে বলিয়া উল্লেখ পাওয়া যায়। কঠোর সাধন বলে দুই এক জীবনেই জাহান্নাম ও জান্নাতের স্তরগুলি অতিক্রম করা সম্ভব হইতে পারে।

Comments

Popular Posts